Image description

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বান্দারাজার পাড়া এলাকার সেই বাড়িটিতে এখন উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল। দুই ভাই সিরাজ ও শহিদের শুক্রবার (১৫ মে) দেশে ফেরার কথা ছিল। তাদের আগমনে ছোট ভাই এনামের বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা, ঘরে আসার কথা নতুন বউ। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে বিয়ের সেই রঙিন স্বপ্নগুলো এখন ধূসর কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। যে বাড়িটিতে বিয়ের সানাই বাজার কথা ছিল, সেখানে এখন চার সহোদরের লাশের জন্য চলছে অপেক্ষা।

মঙ্গলবার (১২ মে) রাতের সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাড়া করে বেড়াচ্ছে স্বজনদের। অসুস্থ বড় ভাই রাশেদকে ডাক্তার দেখাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিলেন শাহেদুল, সিরাজ ও শহিদ। কিন্তু চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়ির ভেতরেই এসি চালিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কে জানত, সেই বিশ্রামই হবে তাদের জীবনের শেষ ঘুম। গাড়ির ভেতর জমে ওঠা বিষাক্ত গ্যাসে যখন তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন, তখন শেষ চেষ্টায় সিরাজ তার এলাকার প্রবাসী বন্ধু পারভেজকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। 

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলা সেই আর্তনাদ ছিল এমন– ‘পারভেজ তুরা কোথায়… তুর কাছে গাড়ি আছে না? থাকলে একটু মুলাদ্দা আয়। আমার বদ্দাকে (বড় ভাইকে) ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছি। এখন আমরা গাড়ি থেকে নামতে পর্যন্ত পারছি না… আমরা চারজনও পারছি না… কাউকে নিয়ে আসো।’ সেই আকুতি পারভেজের কাছে পৌঁছালেও ততক্ষণে চার ভাইয়ের প্রাণবায়ু নিভে গেছে। এই ভয়েস রেকর্ড এখন ভাইরাল হয়ে ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বুধবার তাদের মৃত্যুর খবর এলাকায় আসতেই পুরো এলাকাজুড়ে চলছে শোকের মাতম।
 
পুরো গ্রাম যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে। একমাত্র বেঁচে থাকা ভাই এনাম শোকে বাকরুদ্ধ। অসুস্থ মা ফরিদা বেগমকে এখনো ঘটনার ভয়াবহতা পুরোপুরি জানানো হয়নি; তার শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে বাড়ির ভেতর কিংবা উঠানে বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবুও শত শত মানুষ ভিড় করছেন সেই উঠানের বাইরে রাস্তায়, যেখানে কয়েকদিন পরই পেন্ডেল হওয়ার কথা ছিল বিয়ের।

তাদের ছোট ভাই মো. এনাম জানান, তাদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চারজনই দীর্ঘদিন ধরে ওমানে ছিলেন। তিনি একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি পাশে একটি কম্পিউটার দোকান চালান। তাদের মধ্যে সিরাজ ও শহিদ অবিবাহিত, আগামী ১৫ মে তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। দেশে আসার প্রস্তুতিতে কেনাকাটার জন্য চার ভাই একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। এরমধ্যে বড়ভাইকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

ওমানের চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী এই ঘটনাকে প্রবাসের ইতিহাসে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

চার ভাইয়ের এই একসঙ্গে চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং পুরো রাঙ্গুনিয়ার আকাশে এক শোকের ছায়া। এখন শুধু অপেক্ষা, কখন আসবে সেই কফিনগুলো আর কখন চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন এই চার সংগ্রামী রেমিট্যান্স যোদ্ধা।