“চলো বাবা, এবার আমাদের যেতে হবে।” কিন্তু আমার ছেলের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। খেলার মাঠের বালুগুলো ছিল একদম জুতসই, তাই সে তার নতুন খেলনা এসক্যাভেটর দিয়ে মনের সুখে গর্ত খুঁড়ছিল।
আমি যখন নিজের কাজের তালিকায় মন দিয়েছি, হঠাৎ দেখি হাসির শব্দ কান্নায় বদলে গেল। আমার ছেলে আঘাত পায়নি, কিন্তু সে ভীষণ মন খারাপ করে আছে। ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওর দুপুরের খাবারের সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে—অর্থাৎ সে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিল।
বয়স যাই হোক না কেন, শরীরে জ্বালানির অভাব হলে আমাদের সবারই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। মানুষের জন্মের পর থেকেই এই অভিজ্ঞতা হয়ে আসলেও, এই অনুভূতি প্রকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট শব্দ ২০১৮ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে জায়গা করে নেয়। শব্দটি হলো—'Hangry' (হ্যাংরি): ক্ষুধার ফলে মেজাজ খারাপ বা খিটখিটে হয়ে যাওয়া (Hungry + Angry)। অবাক করার বিষয় হলো, ক্ষুধা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন মেজাজকে প্রভাবিত করে, সে বিষয়ে গবেষণার পরিমাণ বেশ কম।
খাবার এবং মেজাজের ওপর করা বেশিরভাগ গবেষণাই মূলত মেটাবলিক বা খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের ওপর ফোকাস করে। সম্ভবত মনোবিজ্ঞানীরা ক্ষুধাকে কেবল একটি মৌলিক শারীরিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখে এসেছেন। তাই আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে এটি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিই যে, ভিন্ন ভিন্ন মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, কেন কেউ কেউ ক্ষুধার্ত অবস্থাতেও শান্ত থাকতে পারেন। সম্ভবত এখান থেকে ছোট বাচ্চাদের সামলানোর কিছু কৌশলও পাওয়া যেতে পারে।
চমকপ্রদ ফলাফল
প্রাণিজগতে ক্ষুধাকে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্ষুধার্ত ইঁদুররা খাবারের জন্য অনেক উঁচু দেয়াল টপকাতে বা বারবার লিভার চাপতে দ্বিধা করে না। বন্য প্রাণীরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের খোঁজে আরও বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং অনেক দূর পর্যন্ত পরিভ্রমণ করে।
মানুষের শক্তির মাত্রা, ক্ষুধা এবং মেজাজের সম্পর্ক বোঝার জন্য আমরা ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে এক মাসের জন্য একটি 'কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর' পরিয়ে দিই। গ্লুকোজ হলো শরীর ও মস্তিষ্কের প্রধান শক্তির উৎস। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করতে সাধারণত এটি ব্যবহৃত হয়। অংশগ্রহণকারীরা অ্যাপের মাধ্যমে তাদের গ্লুকোজের মাত্রা দেখতে পারতেন এবং আমরাও নজর রাখতাম তারা কখন তা পরীক্ষা করছেন। পাশাপাশি দিনে দুবার স্মার্টফোনের মাধ্যমে তাদের ক্ষুধার মাত্রা (০ থেকে ১০০ স্কেলে) এবং বর্তমান মেজাজ সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হতো।
গবেষণার ফলাফল আমাদের অবাক করে দেয়। প্রথমত, মানুষের মেজাজ শুধু তখনই খারাপ হতো যখন তারা সচেতনভাবে অনুভব করতেন যে তারা ক্ষুধার্ত—কেবল রক্তের শর্করার মাত্রা কমে গেলেই মেজাজ খারাপ হতো না। দ্বিতীয়ত, যারা সাধারণত তাদের শরীরের শক্তির মাত্রা সঠিকভাবে বুঝতে পারতেন, তাদের মেজাজ অতটা খিটখিটে হতো না।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষের শক্তি এবং মেজাজের স্তরের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক ধাপ রয়েছে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন 'ইন্টারোসেপশন' বা শরীরের অভ্যন্তরীণ সংকেত বোঝার ক্ষমতা।
মস্তিষ্কে ক্ষুধার সংকেত দেয় 'হাইপোথ্যালামাস'-এর নিউরনগুলো। আর ক্ষুধার সচেতন অনুভূতি যুক্ত থাকে মস্তিষ্কের 'ইনসুলা' নামক অংশের সাথে, যা স্বাদ গ্রহণ এবং আবেগ প্রক্রিয়াকরণেও ভূমিকা রাখে। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারোসেপ্টিভ ক্ষমতা বেশি ছিল, তাদের মেজাজের পরিবর্তন কম হয়েছে। এর মানে এই নয় যে তারা ক্ষুধার্ত বোধ করেননি—তারা কেবল তাদের মেজাজকে স্থির রাখতে বেশি দক্ষ ছিলেন।
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মেজাজের হঠাৎ পরিবর্তন পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীদের সাথে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগপ্রবণ আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে—যার ফলে মানুষ অস্বাস্থ্যকর ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে।
অপ্রস্তুত অবস্থা
ছোট শিশুদের পক্ষে তাদের দ্রুত বর্ধনশীল শরীরের সমস্ত সংকেত বোঝা কঠিন। তারা চারপাশের বিষয় নিয়ে এতই মগ্ন থাকে যে, অনেক সময় তৃষ্ণা বা ক্ষুধার কথা ভুলে যায়—যার ফলে খেলার মাঠে আমার ছেলের মতো হঠাৎ কান্নাকাটি বা 'মেল্টডাউন' শুরু হয়।
একইভাবে, আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও শরীরের শক্তির মাত্রার দিকে খেয়াল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর একটি সহজ সমাধান হলো নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত খাবার খাওয়া। কারণ আমরা যখন খাবার এড়িয়ে চলি, তখনই ক্ষুধা বেশি জেঁকে বসে।
সবার শক্তির মাত্রা সমান থাকে না। তবে নিয়মিত ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনি আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ সংকেতগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে শিখতে পারেন এবং মেটাবলিজম উন্নত করতে পারেন।
মেজাজ খারাপ হওয়ার পেছনে ক্ষুধা ছাড়া আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে খেলার মাঠের সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি, শিশুর ক্ষুধার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার অনেক আগেই তার খাবারের প্রয়োজন মেটানো জরুরি। সম্ভবত আমাদের সবারই 'হ্যাংরি' হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
লেখক: মেডিকেল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অফ টুবিঞ্জেন।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি




Comments