মারুফ সরকার ইন্টার্নি ডাক্তার। সদ্য মেডিকেল কলেজ থেকে বের হওয়া তরুণ চিকিৎসক। হাসপাতালের করিডোরে তাঁর দিন-রাত কেটে যায় রোগীদের সেবা করতে করতে।
মারুফের পরিবার রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ধারার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দাদা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। বাবা সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধায় এবং পরে জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে অবসর নেন। ছোটবেলা থেকেই মারুফ শুনে এসেছে—"মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিবারের অহংকার।"
২০২৪ সালের জুলাই। দেশের নানা জায়গায় আন্দোলন, উত্তেজনা, সংঘর্ষ। একদিন দুপুরের পরপরই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একের পর এক আহত মানুষ আসতে শুরু করল। কেউ ছাত্র, কেউ পথচারী, কেউ শ্রমজীবী। কারও মাথা ফেটে গেছে, কারও বুক জখম, কারও শরীর রক্তে ভেজা।
মারুফ প্রথমে ভেবেছিল, এ তো আর দশটা জরুরি দিনের মতোই হবে। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হাসপাতাল যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।
একজন মায়ের আর্তনাদ করিডোর কাঁপিয়ে দিল।
—"ডাক্তার সাহেব, আমার ছেলেটাকে বাঁচান!"
মারুফ অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটির নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বয়স কুড়ির বেশি নয়।
রাত গভীর হলে হাসপাতালের ছাদে গিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। মাথার ভেতর শুধু একটি প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—
"এ জন্যেই কি আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন?"
প্রশ্নটির উত্তর সে খুঁজে পেল না।
পরদিন ভোরে বাবার ফোন এল।
—"অপ্রয়োজনীয় ঝামেলায় জড়িও না। নিজের কাজ করো।"
মারুফ শান্ত গলায় বলল,
—"বাবা, আমি তো নিজের কাজই করছি।"
সেদিন থেকেই সে নিজের কাছে একটি সিদ্ধান্ত নিল। আহত মানুষ কে, কোন মতের, কোন দলের—এসব জানার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকের কাছে সবাই শুধু রোগী।
এরপর শুরু হলো নির্ঘুম দিন-রাত।
কখনো টানা ষোলো ঘণ্টা, কখনো আঠারো ঘণ্টা। খাবার ঠান্ডা হয়ে যেত, চায়ের কাপ স্পর্শ করারও সময় মিলত না। সহকর্মীরা বলত,
—"একটু বিশ্রাম নাও।"
মারুফ শুধু হাসত।
একদিন এক বৃদ্ধ তাঁর হাত ধরে বললেন,
—"বাবা, আমার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ।"
মারুফ মাথা নিচু করে উত্তর দিল,
—"ধন্যবাদ দেবেন না। আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি।"
আরেকদিন একজন আহত পুলিশ সদস্যকে একই যত্নে সেলাই করল, যেভাবে কিছুক্ষণ আগে একজন ছাত্রের ক্ষত বেঁধে দিয়েছিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নার্স অবাক হয়ে বললেন,
—"আপনি কাউকে আলাদা করে দেখেন না?"
মারুফ মৃদু হেসে বলল,
—"রক্তের রং তো সবারই এক।"
সেই রাতে ডায়েরিতে সে লিখল—
"দাদার মুক্তিযুদ্ধ ছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য। আমার মুক্তিযুদ্ধ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য। চিকিৎসকের হাতে ব্যান্ডেজ, স্যালাইন আর স্টেথোস্কোপ—এগুলোও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অস্ত্র হতে পারে।"
কয়েক সপ্তাহ পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো। হাসপাতালের করিডোরে আবার আগের মতো নীরবতা ফিরল।
এক সন্ধ্যায় মারুফ বাড়ির ড্রয়িংরুমে টাঙানো দাদার পুরোনো ছবির সামনে দাঁড়াল। ছবিতে তরুণ মুক্তিযোদ্ধার হাসিমাখা মুখ।
মারুফ ধীরে ধীরে বলল,
—"দাদা, আমি জানি না আপনার সব স্বপ্ন কতটা পূরণ হয়েছে। কিন্তু আমি চেষ্টা করছি—যতদিন সাদা অ্যাপ্রন পরব, আহত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আমার দায়িত্ব পালন করতে।"
জানালার বাইরে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে। হাসপাতালের দিকে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
মারুফ আবার সাদা অ্যাপ্রনটি গায়ে চাপাল।
কারণ সে বিশ্বাস করে—মানুষের জীবন রক্ষা করা কখনো কোনো দল বা মতের নয়; এটি একজন চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনেই সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই খুঁজে পেয়েছে।




Comments