Image description

রাত তখন প্রায় দুইটা। বাইরে হঠাৎ ব্রেক কষার শব্দ। তারপর দরজায় একের পর এক জোরে আঘাত।
— "দরজা খুলুন!"
ঘুম ভেঙে উঠে বসলো মিতু। তার মা ভয়ে কাঁপছেন। আশফাক দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন পুলিশ ঘরে ঢুকে তাকে নিয়ে যেতে শুরু করল।
— "আমার ভাই কী করেছে?" মিতুর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
কেউ কোনো উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির শব্দ মিলিয়ে গেল। ঘরজুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। মায়ের কান্না বারবার ভেঙে দিচ্ছিল সেই নীরবতা। মিতুর চোখেও পানি জমেছিল, কিন্তু সে কাঁদল না। মনে হলো, কান্না করলে যেন ভাইকে আরও দূরে হারিয়ে ফেলবে।
সারারাত তার ঘুম হলো না।
ভোরের আলো ফুটতেই সে তার ছোট্ট রঙ-পেন্সিলের বাক্স, কয়েকটি সাদা কাগজ আর টেপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। শহরের ব্যস্ত ফুটপাতের এক কোণে কাগজ বিছিয়ে বড় অক্ষরে লিখল—
"আমার ভাইয়ের মুক্তি চাই।"
লেখা শেষ করে সে চুপচাপ বসে রইল।
পথচারীরা থমকে দাঁড়াতে লাগল। কেউ কিছু না বলে শুধু লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এগিয়ে এসে বলল,
— "শুধু একটা কাগজে কেন? আরও বড় করে লিখি।"
সে পাশের দোকান থেকে একটি রঙের কৌটা এনে দিল।
আরেকজন বলল,
— "আমার কাছে তুলি আছে।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও কয়েকজন এসে যোগ দিল। কেউ রঙ নিয়ে এল, কেউ চক, কেউ বড় ব্রাশ। কাগজটা তখন আর যথেষ্ট মনে হলো না।
একজন বলল,
— "চলো, রাস্তাটাকেই ক্যানভাস বানাই।"
তারপর শুরু হলো রাস্তার ওপর আঁকা। প্রথমে লেখা হলো বড় বড় অক্ষরে—
"আমার ভাইয়ের মুক্তি চাই।"
তার পাশে কেউ আঁকল একটি খোলা দরজা, যার ওপারে সূর্যের আলো। আরেকজন আঁকল একটি ভাঙা শিকল। কেউ লিখল, "ভয় নয়, সাহস।"
দুপুরের মধ্যে আশপাশের দেয়ালগুলোও রঙে ভরে উঠতে লাগল। প্রতিটি দেয়াল যেন একটি গল্প বলছিল। কোথাও একটি চোখ, যার ভেতরে অশ্রু নয়—আগুনের মতো জেদ। কোথাও একজোড়া হাত, একে অপরকে শক্ত করে ধরে আছে।
মিতু অবাক হয়ে দেখল, তার একা শুরু করা ছোট্ট লেখাটি আর শুধু তার ভাইয়ের কথা বলছে না। সেখানে মানুষ নিজেদের অনুভূতিও যোগ করছে।
এক বৃদ্ধ রিকশাচালক থেমে বললেন,
— "মা, আমি আঁকতে পারি না। কিন্তু একটা তুলি কিনে দিতে পারি।"
এক স্কুলছাত্রী নিজের টিফিনের টাকা দিয়ে ছোট্ট একটি রঙের বাক্স কিনে এনে মিতুর হাতে দিল।
বিকেলের দিকে পুরো রাস্তা যেন এক বিশাল মুক্ত গ্যালারিতে পরিণত হলো। মানুষ ছবি তুলছে, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।
মিতু হাঁটু গেড়ে বসে শেষবারের মতো একটি ছোট্ট পাখি আঁকল। পাখিটির খাঁচার দরজা খোলা।
তার নিচে সে লিখল—
"রঙ মুছে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের আশা মুছে ফেলা যায় না।"
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। লাল আভায় রঙিন হয়ে উঠেছিল দেয়ালগুলো। মিতুর মনে হলো, সে আজ শুধু একটি ছবি আঁকেনি। সে মানুষের নীরবতাকে রঙে রূপ দিয়েছে।
সেদিনের পর শহরের নানা দেয়ালে, নানা রাস্তায় নতুন নতুন গ্রাফিতি আঁকা হতে লাগল। কেউ জানত না প্রথম তুলি কে ধরেছিল। কিন্তু যারা সেদিন সেখানে ছিল, তারা জানত—সবকিছুর শুরু হয়েছিল এক বোনের হাতে লেখা কয়েকটি শব্দ থেকে—
"আমার ভাইয়ের মুক্তি চাই।"

মানবকণ্ঠ/এমআর