জুলাই ২০২৪, ঢাকা শহর যেন দুই রকম বাস্তবতায় বাস করছে। একদিকে রাস্তায় টানটান উত্তেজনা, বিক্ষোভ আর নিরাপত্তা চৌকি। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিদেশি অতিথিদের সামনে একটি স্বাভাবিক পরিবেশ তুলে ধরার প্রস্তুতি।
অডিটোরিয়ামের বাইরে সারি সারি জাতীয় পতাকা, ফুলের টব, হাসিমুখে স্বেচ্ছাসেবক। ভেতরে বিদেশি সাংবাদিক, গবেষক ও অতিথিরা বসছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বললেন, — "দয়া করে সবাই আসন গ্রহণ করুন। অনুষ্ঠান কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হবে।"
পেছনের সারিতে বসে আছে তামান্না। সাধারণ একটি শাড়ি, গলায় আইডি কার্ড। দেখে মনে হবে স্বেচ্ছাসেবক দলেরই একজন।
তার পাশে ফিসফিস করে বলল রাফি, — "সবাই জায়গামতো আছে?"
— "হ্যাঁ। আলাদা আলাদা বসেছে। কেউ বুঝতে পারবে না।"
পরিকল্পনাটা সহজ ছিল। কোনো ভাঙচুর নয়, কোনো বিশৃঙ্খলা নয়। শুধু একটি স্লোগান—যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝিয়ে দেবে, হলরুমে বসে থাকা মানুষগুলোর মনে কী চলছে।
মঞ্চে উপস্থাপক বললেন, — "আমরা বিশ্বাস করি, জ্ঞানচর্চার জন্য একটি শান্ত ও স্থিতিশীল পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ..."
বিদেশি সাংবাদিকরা নোট নিচ্ছেন।
তামান্না ঘড়ির দিকে তাকাল।
দুই...
এক...
হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে উঠল।
উচ্চস্বরে বলল,
— "ওয়ান... টু... থ্রি... ফোর!"
এক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপর যেন হলরুমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একসঙ্গে বজ্রধ্বনি।
— "শেখ হাসিনা ডিটেক্টর!"
সামনের সারি...
পেছনের সারি...
বাম পাশ...
ডান পাশ...
যেন আগে থেকেই ঠিক করা ছিল না, অথচ সবাই একই উত্তর জানত।
বিদেশি সাংবাদিকদের ক্যামেরা এক মুহূর্তে ঘুরে গেল দর্শকদের দিকে।
একজন সাংবাদিক পাশে বসা সহকর্মীকে ইংরেজিতে বললেন, — "It doesn't look scripted. They answered instantly."
আরেকজন দ্রুত ক্যামেরা অন করলেন।
মঞ্চের বক্তা থেমে গেলেন।
কয়েকজন কর্মকর্তা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, — "Please... please... sit down."
কিন্তু ততক্ষণে স্লোগান আরেকবার উঠেছে।
— "ওয়ান টু থ্রি ফোর!"
— "শেখ হাসিনা ডিটেক্টর!"
হলের পরিবেশ কয়েক সেকেন্ডেই বদলে গেল।
তামান্না কাউকে আর কোনো নির্দেশ দিল না। প্রয়োজনও ছিল না।
স্লোগান থেমে গেলে সে শান্তভাবে নিজের ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল।
পাশের একজন বিদেশি সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, — "What does that slogan mean?"
তামান্না শুধু হালকা হাসল।
বলল, — "কখনো কখনো একটা স্লোগান অনুবাদ করলে তার অর্থ বোঝা যায় না। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াই তার অর্থ বলে দেয়।"
সাংবাদিকটি নোটবুকে লিখে রাখলেন।
অডিটোরিয়ামের বাইরে বেরিয়ে তামান্না দেখল, ক্যাম্পাস আগের মতোই আছে—গাছ, পাখি, রোদ।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের সেই সমস্বরে উচ্চারিত জবাব যেন প্রমাণ করে দিয়েছিল, সাজানো মঞ্চ আর বাস্তবতার মধ্যে কখনো কখনো খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট একটি ব্যবধান থাকে।
সেদিনের সেই আন্তর্জাতিক সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলোর কথা হয়তো পরে অনেকেই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু উপস্থিত অনেকের স্মৃতিতে থেকে গিয়েছিল একটি অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত—একটি প্রশ্ন, আর তার মুহূর্তের মধ্যে উঠে আসা শত কণ্ঠের একযোগে উত্তর।
মানবকণ্ঠ/এমআর




Comments