Image description

রাজধানীর খিলক্ষেতে ছাত্রীদের ইভটিজিং (উত্যক্ত) করার প্রতিবাদ করায় একটি বিদ্যালয়ের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। রোববার খিলক্ষেত বাজার সংলগ্ন ৩০০ ফিট অভিমুখী সড়কে পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথে এ বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। আহত শিক্ষার্থীরা সবাই খিলক্ষেতের বরুয়া আলাউদ্দিন দেওয়ান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র এবং এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। স্থানীয় একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সশস্ত্র সদস্যরা একজোট হয়ে এই হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।

বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরুয়া আলাউদ্দিন দেওয়ান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের দীর্ঘদিন ধরে উত্যক্ত করে আসছিল খিলক্ষেত বাজার সংলগ্ন ৩০০ ফিট অভিমুখে থাকা কুড়িল আদর্শ বিদ্যাপীঠসহ অন্য একটি স্কুলের কিছু ছাত্র এবং স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের বখাটেরা। সম্প্রতি এই ইভটিজিংয়ের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানায় আলাউদ্দিন দেওয়ান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বখাটেরা। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই প্রতিবাদী ছাত্রদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল তারা, তবে সে সময় সুযোগ পায়নি। আজ রোববার পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বখাটেরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্থানীয় কিশোর গ্যাং গ্রুপ ‘আশিক গ্যাং’-এর প্রধান 'সুইচ গিয়ার' আশিকের নেতৃত্বে কুড়াতলির কিশোর গ্যাং নেতা মোহাম্মদ আলী, রনি, স্বপনসহ ২৫-৩০ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী লাঠিসোঁটা, রামদা ও সুইচগিয়ারসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা স্কুল ড্রেস পরা শিক্ষার্থীদের এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। হামলার সময় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ৩০০ ফিট সড়কের যানচলাচল কিছুক্ষণের জন্য পুরোপুরি ব্যাহত হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা এগিয়ে এসে আহত ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান। 

হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হলেও, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হওয়া কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় একজনকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

হামলায় গুরুতর জখম হওয়া বড়ুয়া আলাউদ্দীন দেওয়ান উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও এসএসসি পরীক্ষার্থী এস. এম. সালমান ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানায়, তাদের পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল কুর্মিটোলা হাই স্কুলে। পরীক্ষার দ্বিতীয় দিন কুড়িলের কুখ্যাত বখাটে গ্রুপ ‘আশিক গ্যাং’-এর সদস্যরা তাদের স্কুলের ছাত্রীদের উত্যক্ত করতে শুরু করে। সহপাঠী ও ভাই হিসেবে অন্যায় দেখে আমরা চুপ থাকতে পারিনি। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করি এবং বখাটেদের বাধা দিই। তখন শিক্ষকরাও বিষয়টি জানেন এবং বখাটেরা আর এমন করবে না বলে আশ্বাস দেয়। কিন্তু মনে মনে তারা ক্ষোভ পুষে রেখেছিল। আজ শেষ পরীক্ষা দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর খিলক্ষেত মোড়ে আগে থেকেই ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওঁত পেতে ছিল ২০-২৫ জনের বখাটে দলটি। আমাদের দেখামাত্রই তারা বাছবিচারহীনভাবে কোপাতে শুরু করে। প্রথমে আমাকে মারতে এলে আমার বন্ধু বাঁচাতে এগিয়ে আসে, তখন বখাটেরা তার পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে।"

হামলায় সালমানের কানের পাশে চাকুর আঘাতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে চিকিৎসকদের দিতে হয়েছে সাতটি সেলাই। ঘটনার সময় অফিসে কর্মরত থাকা সালমানের বাবা খবর পেয়েই হাসপাতালে ছুটে যান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমার ছেলে ও মেয়ে পরীক্ষা দিয়ে রিকশায় করে বাড়ি ফিরছিল। পথিমধ্যে স্কুল ড্রেস পরা অবস্থাতেই বখাটেরা তাদের রিকশা থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে। কুড়িলের একটি স্কুলের ছাত্ররা আমাদের ছেলেদের ওপর চাকু ও ছুরি নিয়ে হামলা করেছে। এরা কেমন ছাত্র, এদের ভবিষ্যৎ কী?"

ঈদের পর সালমানের বাকি পরীক্ষাগুলো নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, "ঈদের পর আরও পরীক্ষা আছে। কিন্তু এই ঘটনার পর আমরা পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যেন তাঁরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেন এবং এর কঠোর বিচার করেন।"

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন জানান, "আজকের এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হঠাৎ করে হয়নি। প্রায় ৫-৭ দিন আগে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তারই রেশ ধরে আজ দুই স্কুলের শিক্ষার্থীরা সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়ায়।"

ইভটিজিং ও ‘আশিক গ্যাং’-এর প্রতিবাদের কারণে হামলার বিষয়ে জানাতে চাইলে ওসি বলেন, "ইভটিজিংয়ের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য আসেনি। প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে এটিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যকার পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হয়েছে। 

তিনি বলেন, সংঘর্ষে আহত ৫ থেকে ৬ জন শিক্ষার্থী থানায় আশ্রয় নিলে তাদের লিখিত এজাহার দায়ের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলেই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া এলাকার দীর্ঘমেয়াদি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বরুয়া আলাউদ্দীন দেওয়ান উচ্চ বিদ্যালয় এবং আদর্শ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদেরও থানায় ডাকা হয়েছে।