গানের বন্দরে আবার প্রাণের জোয়ার, ব্রহ্মপুত্রে ভাসছে পর্যটনের ‘মাস্তুল’
“ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ি তুই চিলমারির বন্দর”—ভাটিয়ালি ধারার এই অমর গানটির স্রষ্টা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। গানের কথায় যেমন ফুটে ওঠে তৎকালীন নদীবন্দরনির্ভর অর্থনীতি ও জীবনচিত্র, তেমনি চিলমারীকে ঘিরে মানুষের প্রাণের টানও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত চিলমারী আজও তার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদ ছিল পাট, চাল, নুন ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বড় বাণিজ্যকেন্দ্র।নদীপথে বড় বড় স্টিমার ও কার্গো নৌযান ভিড়ত এখানে। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল রেল ও নৌপথের সংযোগস্থল-ফলে বন্দরকেন্দ্রিক বাজার, গুদাম ও আড়ত গড়ে ওঠে। সময়ের পরিক্রমায় নদীর নাব্যতা হ্রাস, যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই জৌলুস কিছুটা ম্লান হলেও চিলমারীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কখনো হারিয়ে যায়নি।
সম্প্রতি চিলমারী বন্দরে যুক্ত হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন প্রমোদ তরী ‘মাস্তুল’। চালু হওয়া এই ভাসমান আয়োজন ইতোমধ্যেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মাস্তুলের উদ্দোক্তাদের একজন সাকিব মাহমুদ বলেন, “উত্তরাঞ্চলের নদীভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা অনেক বড়। ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ চর, সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য আর নদীপাড়ের জীবনযাপন-সব মিলিয়ে চিলমারীকে আমরা একটি আকর্ষণীয় রিভার ট্যুরিজম স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ‘মাস্তুল’-এ নিরাপদ ভ্রমণ, রাত্রিযাপন, দেশীয় খাবার ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধা রাখা হয়েছে, যাতে পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে প্রকৃতি উপভোগ করতে পারেন।”
নদী ও পর্যটন উদ্যোক্তা রেজাউল করিম সুমন জানান, “আমরা যদি সুনামগঞ্জের হাওরে গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারি, তবে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে কেন নয়? উত্তরাঞ্চলের নদী, চর আর পাখির ঝাঁক-সব মিলিয়ে এখানে অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই ‘মাস্তুল’ নিয়ে আসা।”
প্রমোদ তরীটিতে রয়েছে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিরাপদ রাত্রিযাপন, দেশীয় খাবারের আয়োজন এবং লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চিলমারী বন্দর থেকে যাত্রা করে এটি ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ঘুরে আবার বন্দরে ফিরে আসে। শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা সোনালি বালুচর, জেলেদের জীবনযাপন, সূর্যাস্তের লাল আভা-সব মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য তৈরি হচ্ছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
চিলমারী শুধু একটি নদীবন্দর নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি, ভাওয়াইয়া গান, নৌকার হাট এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনধারার প্রতীক। স্থানীয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মিজানুর রহমান মিজান বলেন, “চিলমারীর ঐতিহ্য শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রমোদ তরীর মতো উদ্যোগ আমাদের সেই অতীতকে নতুনভাবে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করেছে। এতে করে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে।”
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাবাসসুম জামান বলেন, “হাওরে নৌবিহারের গল্প শুনেছি, কিন্তু ব্রহ্মপুত্রে এভাবে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। সূর্যাস্তের সময় নদীর দৃশ্য মন ভরে দিয়েছে।”
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আরিফুল ইসলাম জানান, “চিলমারীর নাম গানেই শুনেছি। বাস্তবে এসে দেখলাম জায়গাটি কত সম্ভাবনাময়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় রিভার ট্যুরিজম স্পট হতে পারে।”
রংপুরের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব লিটন চৌধুরী বলেন, “উত্তরাঞ্চল এতদিন পর্যটনে পিছিয়ে ছিল। এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।”
সাপ্তাহিক ‘ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস’-এর প্রকাশক এরশাদুল করিম রাজুর মতে, “পর্যটন বাড়লে পরিবেশ রক্ষায়ও নজর দিতে হবে। নদীর নাব্যতা, চরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় সংস্কৃতি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “পর্যটক বাড়লে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, নৌকার মাঝি-সবাই উপকৃত হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।”
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে চিলমারী–ব্রহ্মপুত্র অঞ্চল উত্তরবঙ্গের অন্যতম রিভার ট্যুরিজম করিডর হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত হবে।
চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র আর রংপুরের তিস্তা-এই দুই নদীকে ঘিরে টেকসই পর্যটন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্রে যুক্ত হতে পারে সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়। নদী, চর আর মানুষের জীবনগাঁথা মিলিয়ে চিলমারী আবারও হয়ে উঠতে পারে প্রাণের বন্দর।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments