Image description

ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার সামনে একটি পুরনো জীর্ণ ভ্যান নিয়ে সারাদিন অপেক্ষা করেন ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল বারেক। গত ২৫ বছর ধরে এই ভ্যানটিই তার ছায়াসঙ্গী, আর তার নিত্যদিনের যাত্রী হলো নিথর দেহ। সাধারণ মানুষ যেখানে বীভৎস মরদেহ দেখে আঁতকে ওঠে কিংবা পচা-গলা লাশের দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরে, সেখানে বারেক এক নির্লিপ্ত ও অকুতোভয় সারথি। হাতে গ্লাভস কিংবা মুখে রুমাল ছাড়াই অবলীলায় ছিন্নভিন্ন কিংবা গলিত দেহ ভ্যানে তুলে নেন তিনি। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন ‘লাশের ভ্যানচালক বারেক’ নামেই অতি পরিচিত।

একসময় সামান্য রক্ত দেখলেই যিনি জ্ঞান হারাতেন, আজ জীবিকার তাগিদে সেই মানুষটির কাছে লাশ আর ভয়ের কোনো নাম নেই। দীর্ঘ এই পথচলায় বারেক প্রায় সহস্রাধিক মৃতদেহ বহন করেছেন। তার এই পেশার অভিজ্ঞতা যেমন বিচিত্র, তেমনি রোমহর্ষক।

বারেক শুধু মরদেহ বহনই করেন না, প্রয়োজনে হয়ে ওঠেন লাশের অতন্দ্র প্রহরী। তার দায়িত্ববোধ নিয়ে কনস্টেবল আব্দুল কাদির এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা জানান। একবার ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭ জন। রাতে থানা কমপ্লেক্সের সামনে লাশগুলো পাহারার দায়িত্বে ছিলেন বারেক। সারাদিনের খাটুনি শেষে রাতের খাবার খেয়ে ক্লান্ত বারেক শোয়ার জায়গা না পেয়ে ওই ৭টি লাশের সারিতেই একটি সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। মধ্যরাতে ডিউটিরত কনস্টেবল টর্চের আলো ফেলতেই আঁতকে ওঠেন—৭টি লাশের জায়গায় শুয়ে আছে ৮টি দেহ! মুহূর্তেই থানায় ‘লাশ বেড়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেখা যায়, কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং লাশের পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন পরিশ্রান্ত বারেক।

শহরের ছয়গণ্ডা এলাকার মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে বারেকের সম্পদ বলতে কেবল দেড় শতাংশের এক চিলতে ভিটে। ঘরে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও নাতি-নাতনিসহ ছয় জনের বিশাল সংসার। বারেক জানান, অজ্ঞাতনামা লাশ বহনে পুলিশের কাছ থেকে ৩-৪ হাজার টাকা পান, যার বড় অংশই চলে যায় ময়নাতদন্তের আনুষঙ্গিক খরচে। উৎসবের দিনে সবার ঘরে আনন্দ থাকলেও বারেকের ঘরে চুলা জ্বলে কোনো এক লাশের খবর এলে।

গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, “বীভৎস বা দুর্গন্ধযুক্ত লাশ উদ্ধারে বারেক আমাদের একমাত্র ভরসা। অনেক পুলিশ সদস্যও যখন লাশ ছুঁতে সাহস পান না, তখন বারেক সাহসের সাথে তা ময়নাতদন্তের ব্যাগে ভরে দেন। তার দায়িত্বশীলতা অতুলনীয়।”

বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো ভ্যান চালাতে পারেন না বারেক। দীর্ঘ ২৫ বছর সমাজের শেষ সেবাটি দিলেও তার নিজের জীবনের চাকাটি থমকে আছে অভাবের চাকায়। বারেক আক্ষেপ করে বলেন, “শরীরে আর কুলায় না। একটা মোটরচালিত ভ্যান থাকলে শেষ বয়সে একটু শান্তিতে লাশগুলো টানতে পারতাম। কিন্তু সেই টাকা জোগাড় করার সাধ্য আমার নাই।”

মানবকণ্ঠ/ডিআর