Image description

বাংলাদেশে উন্নয়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, তা একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক, অন্যদিকে তেমনি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক গভীর সংকটের পূর্বাভাস। এতদিন প্লাস্টিক দূষণ বলতে আমরা মূলত নদী, খাল-বিল কিংবা সড়কের দৃশ্যমান আবর্জনাকেই বুঝেছি। কিন্তু প্লাস্টিকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রাসায়নিক ঝুঁকির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত। দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি নীরবে বাড়ছে এক অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। 

সাম্প্রতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, এই অবহেলার মূল্য ভবিষ্যতে ভয়াবহ হতে পারে। প্লাস্টিককে নমনীয়, টেকসই ও ব্যবহারোপযোগী করতে যে থ্যালেট ও বিসফেনলের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো কেবল শিল্পকারখানার উপাদান নয়; এগুলো মানবদেহের জন্য সরাসরি হুমকি। এই রাসায়নিকগুলো ‘এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল’ অর্থাৎ এগুলো শরীরের হরমোন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে মানুষের প্রজনন ক্ষমতা, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, এমনকি মানসিক ও শারীরিক বিকাশেও। দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই ঝুঁকি থেকে কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। শিশুদের খেলনা, স্কুলের সামগ্রী, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, রান্নাঘরের প্লাস্টিক পাত্র, এমনকি দোকানের রসিদ- সব জায়গাতেই এই রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরেই অদৃশ্যভাবে বিষ ঢুকে পড়ছে। শিশুরা খেলতে খেলতে, শিক্ষার্থীরা স্কুলে ব্যবহার করতে গিয়ে, আর সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটার মাধ্যমে অজান্তেই এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছেন।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, সাভার ও টঙ্গীর মতো এলাকায় থ্যালেটের মাত্রা পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব এলাকার বাতাস, পানি ও মাটিতে এই রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরাও প্রতিনিয়ত উচ্চমাত্রার ঝুঁকির মুখে থাকছেন। অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে প্লাস্টিক শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এটি এখন বহু কোটি ডলারের একটি বাজারে পরিণত হয়েছে। 

এই খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২০ শতাংশ, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি যদি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে এগোয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের সুফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এখানে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নীতিগত শূন্যতা। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে থ্যালেট ও বিসফেনলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের পণ্য ও খাদ্যসংক্রান্ত উপকরণে এসব রাসায়নিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

অথচ বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে ওঠেনি। পণ্যের মোড়কে রাসায়নিকের তথ্য উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা না থাকায় ভোক্তারা অন্ধকারেই রয়ে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী? প্রথমত, অবিলম্বে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে থ্যালেট ও বিসফেনলের ব্যবহার, আমদানি ও বিপণন নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকবে। 

দ্বিতীয়ত, পণ্যের লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে পারেন। তৃতীয়ত, বিকল্প নিরাপদ উপাদান ব্যবহারে শিল্পখাতকে উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে প্রণোদনা দিতে হবে। চতুর্থত, নিয়মিত মনিটরিং ও গবেষণার মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। 

একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। মানুষ যদি নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন না হয়, তাহলে কোনো নীতিমালাই পুরোপুরি কার্যকর হবে না। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্লাস্টিকের দৃশ্যমান দূষণ যতটা চোখে পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হলো এর অদৃশ্য রাসায়নিক প্রভাব। এই নীরব বিপদ ধীরে ধীরে আমাদের সমাজকে গ্রাস করছে। তাই এখনই সময়- নীতি, সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করার। 

অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাব এক অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পৃথিবী, যার দায় এড়ানোর সুযোগ আমাদের থাকবে না। প্লাস্টিক দূষণের দৃশ্যমান দিক নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, তার রাসায়নিক ঝুঁকি নিয়ে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ এই অদৃশ্য বিপদই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সময় সতর্ক হওয়ার, সচেতন হওয়ার এবং কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আর কোনো বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়।