আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি (PGA) নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের গোপন ব্যালটে ৯৯ ভোট পেয়ে তিনি বিজয়ী হন।
তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। অর্থাৎ ৮ ভোটের ব্যবধানে বিশ্ব সভার এই শীর্ষ পদে জয়লাভ করল বাংলাদেশ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছে লাল-সবুজের প্রতিনিধি। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া ৮১তম অধিবেশনে এক বছর মেয়াদী এই দায়িত্ব পালন করবেন খলিলুর রহমান। এবারের সভাপতি পদটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। ফলে খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বেই নতুন জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। এছাড়া চলমান বৈশ্বিক সংকট, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জাতিসংঘের সংস্কার প্রচেষ্টার মধ্যে তাঁর এই নেতৃত্বকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি কেবল আলঙ্করিক নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ব্যাপক প্রশাসনিক ও নৈতিক ক্ষমতা। সভাপতির প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে:
অধিবেশন পরিচালনা: ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের আলোচনা সমন্বয় ও অধিবেশন পরিচালনা করা।
বাজেট নিয়ন্ত্রণ: জাতিসংঘের মূল বাজেট এবং শান্তিরক্ষা (পিসকিপিং) কার্যক্রমের বাজেট সাধারণ পরিষদেই পাস হয়, যেখানে সভাপতির প্রভাব থাকে অত্যন্ত জোরালো।
নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা: বিভিন্ন বিবাদমান গোষ্ঠীর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তিনি নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন।
সভাপতি নির্বাচনের আগে দেওয়া ‘ভিশন স্টেটমেন্ট’-এ খলিলুর রহমান তাঁর মেয়াদের জন্য ছয়টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ত্বরান্বিত করা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার রক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদীয়মান প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, এই বিজয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সাধারণ পরিষদে গৃহীত আর্থিক ও বাজেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো মানতে সব দেশ বাধ্য থাকে, তাই এই পদে বাংলাদেশের আসন পাওয়া দেশের জন্য বড় এক নৈতিক বিজয়।
সরকারের পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments