ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর দেশটির কর্তৃপক্ষের কঠোর দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন, ঠিক তখনই কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের কিছু সামরিক কর্মী সরিয়ে নিচ্ছে।
বিবিসি-র মার্কিন অংশীদার সিবিএস-কে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকার এই আংশিক প্রত্যাহার একটি "সতর্কতামূলক পদক্ষেপ"। বিবিসির কাছে তথ্য রয়েছে যে, যুক্তরাজ্যের কিছু সামরিক কর্মীকেও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কাতার সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ মূলত "বর্তমান আঞ্চলিক উত্তজনা বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া"।
এদিকে ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র দপ্তর তেহরানে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। তবে দূতাবাসের কার্যক্রম আপাতত দূরবর্তী বা ‘রিমোট’ পদ্ধতিতে চলবে। দোহার মার্কিন দূতাবাস তাদের কর্মীদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন এবং আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ইরান বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ০২:৪৫ (জিএমটি ২২:১৫) থেকে প্রায় সব ধরনের ফ্লাইটের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। রয়টার্স জানিয়েছে, শুরুতে এটি দুই ঘণ্টার জন্য হলেও পরে সময় বাড়িয়ে স্থানীয় সময় সকাল ০৮:০০টা পর্যন্ত করা হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় এয়ার ইন্ডিয়া এবং জার্মানির লুফথানসাসহ বেশ কিছু এয়ারলাইন্স ইরানের ওপর দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লুফথানসা এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা ইরান ও ইরাকের আকাশসীমা এড়িয়ে চলবে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইরানে সাম্প্রতিক সহিংস দমন-পীড়নে ২,৪০০-এর বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
সামরিক কর্মী প্রত্যাহারের বিষয়ে কাতার সরকার জানিয়েছে, তারা তাদের নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখবে। তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র 'কার্যকরী নিরাপত্তা'
রক্ষার স্বার্থে কর্মী সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আল-উদেইদ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি। এখানে প্রায় ১০,০০০ মার্কিন এবং ১০০ ব্রিটিশ সামরিক কর্মী মোতায়েন রয়েছেন। তবে ঠিক কতজন কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেয় তবে যুক্তরাষ্ট্র "অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ" নেবে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে। তবে গত বুধবার ট্রাম্প জানান, তিনি 'নির্ভরযোগ্য সূত্রে' জানতে পেরেছেন যে ইরানে হত্যাকাণ্ড থামছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।
রয়টার্স জানিয়েছে, কিছু কর্মীকে আল-উদেইদ ঘাঁটি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও গত বছরের ইরানি হামলার আগের পরিস্থিতির মতো বড় কোনো সেনা প্রত্যাহারের লক্ষণ দেখা যায়নি।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গত জুনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে সতর্ক করেছেন। একইসঙ্গে তিনি ২৬ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর নাকচ করে দিয়ে বলেন, "আজ বা কাল ফাঁসি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।"
ইরানের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইতালি এবং পোল্যান্ড তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। জার্মানিও আকাশপথের অপারেটরদের তেহরানে ফ্লাইট না চালানোর সুপারিশ করেছে।
ইরান সরকার অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের একটি অজুহাত খুঁজছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ও জাহাজ কেন্দ্রগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ডিসেম্বরের শেষে ইরানে মুদ্রার মান কমে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। যা দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয় এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ নিশ্চিত করেছে যে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ১২ জন শিশুসহ ২,৪০৩ জন নিহত এবং ১৮,৪৩৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে "নজিরবিহীন মাত্রায় বেআইনি হত্যাকাণ্ড" হিসেবে অভিহিত করে জাতিসংঘকে নিরাপত্তা বাহিনীর এই অপরাধের স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
Comments