Image description

ভারতীয় বিমান ও এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর আকাশপথ ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা আরও এক মাস বাড়িয়েছে পাকিস্তান। দেশটির এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা নতুন এক ‘নোতাম’ অনুযায়ী, আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতও খুব শীঘ্রই পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পাকিস্তানি বিমানের জন্য তাদের আকাশপথ বন্ধের মেয়াদ বাড়াবে। এর ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার আকাশপথ সংক্রান্ত এই অচলাবস্থা টানা ১০ম মাসে পদার্পণ করতে যাচ্ছে।

গত বছরের এপ্রিলে পহেলগাম জঙ্গি হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এর জেরে গত ২৪ এপ্রিল পাকিস্তান প্রথম তাদের আকাশপথ ভারতীয় নিবন্ধিত বা লিজ নেওয়া বিমানের জন্য বন্ধ করে দেয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারতও ৩০ এপ্রিল থেকে পাকিস্তানি বিমানের ওপর একই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকে প্রতি মাসেই উভয় দেশ এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে আসছে। তবে একে অপরের জন্য আকাশপথ বন্ধ রাখলেও অন্যান্য দেশের এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য উভয় দেশের আকাশপথ খোলা রয়েছে।

পাকিস্তানের এই নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রতি সপ্তাহে ভারতের প্রায় ৮০০টি ফ্লাইট সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর ভারত থেকে পশ্চিম এশিয়া, ককেশাস অঞ্চল, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য এবং উত্তর আমেরিকার পূর্ব দিকের দেশগুলোতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বিমানগুলোকে এখন দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে গন্তব্য ভেদে ফ্লাইটের সময় ১৫ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ রুটে চলাচলের কারণে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং ক্রু ও ফ্লাইটের সময়সূচী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা ‘এয়ার ইন্ডিয়া’র হিসাব মতে, এই অচলাবস্থার কারণে বছরে তাদের প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

আকাশপথ বন্ধ থাকায় বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলোকে বিকল্প রুট খুঁজতে হচ্ছে। যেমন, ইন্ডিগো তাদের দিল্লি থেকে মধ্য এশিয়ার শহর আলমাতি ও তাসখন্দ রুটের ফ্লাইটগুলো স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ বর্তমানে যে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে, তা তাদের ন্যারো-বডি (ছোট আকারের) বিমানের জ্বালানি ক্ষমতার বাইরে।

ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বেশ নগণ্য। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা পিআইএ বর্তমানে নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যাও সীমিত। এভিয়েশন অ্যানালিটিক্স কোম্পানি ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে প্রতি সপ্তাহে পিআইএ-এর মাত্র ছয়টি ফ্লাইট (কুয়ালালামপুর থেকে লাহোর বা ইসলামাবাদগামী) ভারতের ওপর দিয়ে চলাচল করত।

পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত ভারতের ক্রমবর্ধমান এভিয়েশন খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রুটে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের সময়ে এই বাড়তি সময় ও জ্বালানি খরচ এয়ারলাইন্সগুলোর মুনাফায় বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কূটনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত এই ‘আকাশ-যুদ্ধ’ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর এর আর্থিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ২০১৯ সালে পাকিস্তান যখন চার মাসেরও বেশি সময় তাদের আকাশপথ বন্ধ রেখেছিল, তখন ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিতভাবে আনুমানিক ৭০০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছিল। মূলত দীর্ঘ পথ ঘুরে যাওয়ার কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ এবং পরিচালনগত সমস্যার ফলেই এই লোকসান হয়। সে সময় এয়ার ইন্ডিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কারণ তারা পশ্চিমমুখী আন্তর্জাতিক রুটে বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করত। এছাড়া উত্তর আমেরিকায় অতি-দীর্ঘপাল্লার সেবা প্রদানকারী একমাত্র ভারতীয় সংস্থা হিসেবে তারা আগের মতোই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্ডিগোসহ অন্যান্য ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলো তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে। তারা তাদের বর্তমান ন্যারো-বডি (ছোট আকারের) জেট বিমানগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সেবা দিচ্ছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইন্ডিগোই বর্তমানে একমাত্র ভারতীয় এয়ারলাইন্স যা মধ্য এশিয়া, ককেশাস এবং তুরস্কে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস