মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই চীন থেকে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কাঁচামাল বহনকারী কয়েকটি জাহাজ ইরানে পৌঁছেছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক সরবরাহ নয়, বরং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় ভূরাজনৈতিক কৌশল।
ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক বিশেষ বিশ্লেষণে জানা গেছে, গাজা ও লেবানন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত চারটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি জাহাজ দেশটির বন্দরে ভিড়েছে এবং আরও একটি জাহাজ উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছে। চীনের ঝুহাই শহরের গাওলান বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা এই জাহাজগুলো মূলত রাসায়নিক বহনের জন্য বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই জাহাজগুলোতে ‘সোডিয়াম পারক্লোরেট’ বহন করা হয়েছে। এটি কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি অপরিহার্য উপাদান। মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করে ইরান অন্তত ৭৮৫টি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। যার ফলে বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ১০ থেকে ৩০টি করে ক্ষেপণাস্ত্র এক মাস পর্যন্ত অনায়াসেই ছুড়তে পারবে তেহরান।
মধ্যপ্রাচ্যের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের মুখে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। এই আমদানি মূলত সেই ঘাটতি পূরণেরই একটি চেষ্টা। সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিএনএন-কে জানিয়েছে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনো অক্ষত রয়েছে। নতুন এই চালান দেশটির উৎপাদন ক্ষমতাকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে।
তদন্তে দেখা গেছে, এই জাহাজগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান শিপিং লাইন গ্রুপ’-এর অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়াতে তারা অত্যন্ত সুক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ রাখা, ভুয়া গন্তব্য দেখানো এবং মাঝপথে জাহাজের নাম পরিবর্তন করা। এই কৌশলগুলো আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এদিকে চীনের ভূমিকা নিয়েও বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বেইজিং সরাসরি সামরিক সহায়তার কথা অস্বীকার করলেও, রাশিয়ার মতোই ইরানের ক্ষেত্রেও ‘বাণিজ্যিক পণ্যের’ আড়ালে দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিশাল অবকাঠামো বিনিয়োগ থাকায়, ইরানের মাধ্যমে এই অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা বেইজিংয়ের জন্য একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সামরিক সক্ষমতা অর্জন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল করে তুলতে পারে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments