Image description

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। দেশের জন্য তার ত্যাগ-তিতিক্ষা, কারাগারে নির্যাতন-নিপীড়নের কথা বর্ণনা করে তারা বলেছেন, দেশের ইতিহাসে অন্যতম এই নেতা সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন।

বিশিষ্ট নাগরিকদের ভাষ্য, জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তার উপস্থিতি, পরামর্শ এবং দিক-নির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। তার শাসন আমলে দেশের অর্থনীতিতে উন্নতি, শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য তার উদ্যোগের কথা স্মরণ করেন তারা।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে নাগরিক শোকসভায় বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট জনেরা।

বেলা তিনটার দিকে সভায় উপস্থিত হন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি। 

এরপর বেলা তিনটা ৫ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শোকসভা। পরে শোকগাঁথা পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠান শুরুর আগে খালেদা জিয়াকে নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। শেষে খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সময়ের মৃত্যু হয়নি, ইতিহাসেরও মৃত্যু হয়নি। আগামী দিনের যে ইতিহাস এই জনপদে সৃষ্টি হবে, তার চালিকাশক্তি হবে খালেদা জিয়া ও তার আদর্শ।

গৃহবধূ থেকে রাজপথে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠা খালেদা জিয়া দেশ ও জনপদকে ভালোবাসতেন। দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়া এই সাবেক চেয়ারপারসন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, ছিলেন একাধিকবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং গণতান্ত্রিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশীজন।

এসব কথা উল্লেখ করে বিশিষ্টজনেরা বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অসাধারণ দৃঢচেতা। রাজনীতি সংগ্রাম ও কঠিন সময়ের মধ্যেও তিনি ধৈর্যের ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন।

খালেদা জিয়া একজন বিচক্ষণ এবং সত্যিকারের একজন দেশনেত্রী বলেও বক্তারা বলেন। তারা খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক রাষ্টীয় উপাধি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্য সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, ‘খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার মামলায় দীর্ঘদিন কারাবাস করেছেন। এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। তিনি বলেছিলেন- ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসায় শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আমি দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বয়ান নয়। আমার বিবেচনায় তিনি একজন বিচক্ষণ, সত্যিকারের একজন দেশনেত্রী। আমি সরকারকে অনুরোধ করব খালেদা জিয়াকে যেন সর্বোচ্চ সম্মানসূচক রাষ্টীয় উপাধি দেয়া হয়।’

অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, খালেদা জিয়া এই দেশকে ভালোবাসতেন। এই জনপদকে ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন এই দেশের পানি। এই পানির জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন। ভারত সরকার যখন টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন তিনি আমাদের বলেছিলেন- একটা বড় আকারের সেমিনারের আয়োজন করতে। যাতে আমরা দাবি জানাতে পারি।’

খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণা করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, “তার তিনটি উক্তি আমরা চিরকাল মনে রাখব, এক-‘দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই।’ দুই- ‘আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, ওদের হাতে বন্দির শৃঙ্খল’; এবং তিন- ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, দেশই আমার শেষ ঠিকানা।’ এই মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তার দল এবং এই দেশ রক্ষা পাবে।”

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সময়ের মৃত্যু হয়নি, ইতিহাসের মৃত্যু হয়নি। আগামী দিনের যে ইতিহাস এই জনপদে সৃষ্টি হবে, তার চালিকাশক্তি হবে বেগম খালেদা জিয়া ও তার আদর্শ। যোগ করেন মাহবুব উল্লাহ।

আইন উপদেষ্টা ড. আফিস নজরুল বলেন, সবাই আমরা বেগম জিয়ার জন্য মুক্তভাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ব্যক্ত করতে পারছি। আর উনার (খালেদা জিয়া) অদ্ভুত একটা বিচার হয়েছিল। এত জঘন্য বিচার হয়েছে! এটার বিরুদ্ধে বিবৃতির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। মানে ফোন করেছি। ৪ জনের বেশি রাজি হন নাই। উনি (খালেদা জিয়া) যখন মুমূর্ষু অবস্থায়, উনাকে যেনো বিদেশে পাঠানো হয় এজন্য অনেক মানুষকে অনুনয় করেছি। অনেকের হয়তো ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সাহস করেন নাই।’

সভায় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। একজন স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে আমার মন জয় করে নিয়েছেন তিনি। দেশকে ভালোবেসে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’

মাহফুজ আনাম বলেন, ‘জেল, গৃহবন্দি- এতো কিছুর পরেও উনি যখন ৭ আগস্ট মুক্ত হয়ে ভাষণ দিলেন, সেখানেও তিনি প্রতিশোধের কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয় প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। এই যে উদারতা, সেটা যদি আমরা মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারি তাহলে আমরা জ্ঞাণভিত্তিক দেশ গড়ে তুলতে পারব। আমি সবার কাছে বলব, খালেদা জিয়ার শেষ বাণী জ্ঞাণভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান আমরা যেন সবাই ধারণ করি।’

নিউ এজ সম্পাদক সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে গেছেন যে, তিনি কেবলমাত্র জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানুষের এবং দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তার জানাজায় দল-মতনির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছে।’

নূরুল কবীর বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনীতিক হিসেবে যেমন সাফল্য ছিল, সেই সাফল্য মোকাবিলা করতে গিয়ে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে যে আঘাত দিয়েছেন, তার পরিবারের ওপর যে সমস্ত দুর্ভোগ গেছে- তিনি কখনও প্রকাশ্যে তার বেদনাবোধের কথা, নিন্দাবোধের কথা উচ্চারণ করেননি।’

নূরুল কবীর বলেন, আপাত দৃষ্টিতে এটা খুব সহজ কথা হতে পারে। কিন্তু এই যে সংযম, পরিমিতি বোধ এবং আত্মমর্যাদার রাজনীতি- এই বিষয়টা আজকের বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতার পরিবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। এটা তাকে ইতিহাসে সারাজীবন অনন্যতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।’

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রামের পতাকা আজ তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এটি যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি এক গভীর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জেরও বিষয়। কারণ বাংলাদেশের মানুষ সবসময় তারেক রহমানকে তার পিতা ও মাতার সঙ্গে তুলনা করবে। এই তুলনা অত্যন্ত কঠিন- যেকোনো মানুষের জন্যই।’

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার আলোচনার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার প্রধানতম তিনটা বড় গুণ ছিল। তিনি শুনতেন, তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন দেশের স্বার্থ ও বৈশ্বিক গুরুত্ব বিবেচনায়। আমি বিশ্বাস করি, তাকে জাতি মনে রাখবে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘জাতির এই সন্ধিক্ষণে তার (খালেদা জিয়া) উপস্থিতি, পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা সম্ভবত সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিল। উনি হয়তো চাইতেন আজকের এই চ্যালেঞ্জগুলো নীতিনিষ্ঠভাবে, দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা থেকে যৌথভাবে মোকাবিলা করতে। উনার জীবন বহুমাত্রিক। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল উনার দুই শাসনামলে চারবার নীতিবিষয়ক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার।’

আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়ার সরকারের সময় অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনের শাসন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার নীতি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে। একই সময়ে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তার (খালেদা জিয়া) কিছু উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ সময় তিনি খালেদা জিয়ার শিক্ষা ও মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নেয়া কর্মসূচিগুলোর কথা উল্লেখ করেন।

আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিনের সঞ্চালনায় সভায় গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. রাশেদ আল তিতুমীর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম ফায়েজ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিমিন রহমান, কূটনৈতিক আনোয়ার হাশিম, ডিপিআইর প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার দুলাল, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ, দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান, তত্ত্বাধায়ক সরকারের সাবেক বিশেষ সহকারী রাজা দেবাশীষ রায়, খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী, লেখক ও এক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বক্তব্য দেন।

তবে শোকসভায় কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা মঞ্চে বক্তব্য দেননি।

সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনসহ দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা।