Image description

বাংলাদেশের বিচারিক কাঠামোর শেষ গন্তব্য হলো কারাগার। দিনরাত যেখানে থমকে থাকে। তাত্ত্বিকভাবে একে ‘সংশোধনাগার’ বলা হলেও বাস্তবে এটি এখন পদ্ধতিগত নিপীড়ন, সীমাহীন অব্যবস্থাপনা এবং হাজারো নিরপরাধ মানুষের কান্নার এক অন্ধকার গহ্বর। কারাগারের সুউচ্চ প্রাচীরের আড়ালে যে জীবন অতিবাহিত হয়, তা নাগরিক অধিকারের ন্যূনতম সংজ্ঞা থেকেও বিচ্যুত। 

বাংলাদেশের কারাগারগুলো কেবল অপরাধীদের আবাসন নয়, বরং আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক দুর্নীতির এক নির্মম প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি, চিকিৎসার নামে প্রহসন এবং পলে পলে মানবাধিকারের অপমৃত্যু সব মিলিয়ে দেশের ৬৮টি কারাগার এখন রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল নৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারাগারগুলোর সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান সংকট হলো জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে যেখানে ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৩ হাজার থেকে ৪৫ হাজারের কাছাকাছি, সেখানে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা তার প্রায় দ্বিগুণ, কখনো কখনো তা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার, নেই ঘুমানোর ন্যূনতম জায়গা। এক একটি কক্ষে যেখানে ২০ জনের থাকার কথা, সেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ জনকে। রাতে ঘুমানোর সময় বন্দিদের ‘ইংলিশ ফিটিং’ বা একজনের শরীরের ওপর অন্যজনকে গা ঘেঁষে শুতে হয়। এই মানবেতর পরিবেশের কারণে বন্দিদের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে জায়গার এই তীব্র সংকটের সুযোগ নিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে ‘সিট বাণিজ্য’ নামক এক কুৎসিত ব্যবস্থা। প্রহরীদের যোগসাজশে কতিপয় বন্দি নেতা বা রাইটাররা এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। টাকা দিলে সামান্য একটু মাথা গোঁজার বিছানা মেলে, নতুবা সারারাত মেঝেতে বসে কিংবা দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দিতে হয় শত শত বন্দিকে। এই দৃশ্যপট প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র বন্দিদের কেবল সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করে, রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নয়।

কারাগারের অভ্যন্তরে চিকিৎসা ব্যবস্থা এক প্রকার ভেঙে পড়েছে। প্রায় প্রতিটি কারাগারের হাসপাতালে জনবল সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে। পদের বিপরীতে চিকিৎসক নেই বললেই চলে, আর যারা আছেন তারা বন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে ভুলে গেছেন। একজন অসুস্থ বন্দির জন্য কারাগারের হাসপাতাল যেন এক মরীচিকা। সাধারণ জ্বর, পেটব্যথা বা মাথাব্যথার ওষুধটুকু পাওয়ার জন্য একজন বন্দিকে যে পরিমাণ কাঠখড় পোড়াতে হয়, তা অকল্পনীয়। 

সরকারি বরাদ্দের দামি ওষুধগুলো বন্দিদের না দিয়ে বাইরে কালোবাজারে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি এতোটাই দীর্ঘ, আমলাতান্ত্রিক এবং ব্যয়বহুল যে, অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার আগেই বন্দির প্রাণবায়ু নিভে যায়। পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটে বন্দিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যার ফলে সাধারণ অসুখও এখানে মরণব্যাধিতে রূপ নেয়। কারাগারগুলো সংশোধন কেন্দ্র হওয়ার বদলে ধীরে ধীরে একেকটি মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে।

কারাগারের লোহার ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকা থেকে শুরু করে জামিনে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বন্দিদের অর্থ গুনতে হয়। এই শোষণের জাল বিস্তৃত কারাগারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পিসিতে (প্রিজনার্স ক্যানটিন) খাবারের দাম বাইরের খুচরা বাজারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। পরিবারের পক্ষ থেকে পাঠানো টাকা বা পিসি কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও চলে কমিশন বাণিজ্য। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় সাক্ষাৎকক্ষে। নিজের সন্তান, স্ত্রী বা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখটি দেখার জন্য যে সামান্য সময় বরাদ্দ থাকে, সেটুকুর নিশ্চয়তা পেতেও কারারক্ষীদের উৎকোচ দিতে হয়। টাকা দিলে সময় বাড়ে, কথা বলার সুযোগ মেলে; আর টাকা না দিলে কাঁচের ওপাশে থাকা প্রিয়জনের আর্তনাদটুকুও ঠিকমতো শোনা যায় না। জেলের ভেতরে মাদক সরবরাহ থেকে শুরু করে বিশেষ সুবিধা প্রদান সবই নিয়ন্ত্রিত হয় একটি শক্তিশালী অদৃশ্য সিন্ডিকেট দ্বারা। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কেবল কারাব্যবস্থাকেই নষ্ট করছে না, বরং যারা সামান্য অপরাধে ভেতরে আসে, তাদের আরও বড় অপরাধী হয়ে ওঠার রসদ জোগাচ্ছে।

বাংলাদেশের কারাব্যবস্থার এই সামগ্রিক নৈরাজ্য এবং বিচারিক ব্যর্থতা নিয়ে সম্প্রতি অত্যন্ত জোরালো, সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সাম্প্রতিক এক বক্তব্য দেশের কারাবন্দিদের মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এক নতুন এবং বৈপ্লবিক মাত্রা যোগ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের কারাগারের করুণ দশা বর্ণনা করতে গিয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে বলেন যে, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ কোনো অপরাধ না করেই বছরের পর বছর জেল খাটছে। প্রতিহিংসা আর সাজানো মামলার বলি হয়ে তারা তাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো হারাচ্ছে। এই নিরপরাধ মানুষরা টাকার অভাবে কোন আইনজীবী পাচ্ছে না, পাচ্ছে না তাদের আইনি অধিকার।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় আইন মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন এই নিরপরাধ মানুষদের মুক্তির জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী আরও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, কারাগার কোনোভাবেই অত্যাচারের কারখানা হতে পারে না। তার মতে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন একজন প্রকৃত দোষীও ছাড় না পায়, কিন্তু একজন নিরপরাধ মানুষও যেন এক মুহূর্তের জন্য বিনা বিচারে বন্দি না থাকে। তারেক রহমানের এই বক্তব্য মূলত একটি ন্যায়বিচার ভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার, যেখানে কারাগার হবে মানুষের গ্লানি মোচনের জায়গা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসা সেই ৩০ শতাংশ নিরপরাধ মানুষের সংখ্যাটি আঁতকে ওঠার মতো। এরা সেই হতভাগা মানুষ, যারা হয়তো গ্রামের কোনো মাতব্বরের প্রতিহিংসার শিকার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাজানো মামলার আসামি, অথবা ভুল তদন্তের বলি। এদের বড় অংশই চরম দারিদ্র?্যসীমার নিচে বসবাস করে। এই নিরপরাধ মানুষদের জীবনের গল্পগুলো বড় করুণ। কেউ হয়তো নিজের সন্তানের জš§ দেখতে পারেননি, কেউ বৃদ্ধ বাবার জানাজায় শরিক হতে পারেননি। বছরের পর বছর লোহার শিকের ওপাশে থেকে তাদের শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখের জ্যোতি কমে গেছে, কিন্তু বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। এদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কোনো দামি আইনজীবী নেই, নেই কোনো প্রভাবশালী তদবিরকারক। তাদের দীর্ঘশ্বাস কারাগারের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফেরে, যা আমাদের বিচার ব্যবস্থার জন্য এক বড় কলঙ্ক।

বিনা কারণে ৩০ শতাংশ কারাবন্দির বিষয়ে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, কোনো আসামিকে আমরা ধরে কারাগারে নিয়ে আসি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাদের গ্রেপ্তার করে পাঠায় সেসব আসামির দায়িত্ব গ্রহণ করে আমরা তাদের একটি মানবিক, গঠনমূলক ও সুন্দর আগামীর পথ দেখাই। এদের মধ্যে নিরীহ মানুষও থাকতে পারে। তবে কারা-আইন অনুযায়ী আমরা সবার সঙ্গে সমান আচরণ করতে বাধ্য।

কারাগারে চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতার বিষয়ে তিনি বলেন, কারাগারে ভালো চিকিৎসক এবং চিকিৎসালয় পরিচালনা করতে প্রতিনিয়ত আমরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি। হঠাৎ কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে পাঠাতে হয়। এসময় অ্যাম্বুলেন্স সংকটে আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। কোনো কোনো সময় অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই রোগী মারা যায়। কর্তৃপক্ষকে আমরা এই সংকটের কথা বহুবার বলেছি। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় এর সুরাহা মিলছে না।

কারাগারে মাদকসংশ্লিষ্টতার প্রশ্নে তিনি জিরো টলারেন্স নীতির কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, এই কাজের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত হয় তাদের বিরুদ্ধে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শনের সুযোগ নেই।

কারাগারকে বলা হয় সংশোধনাগার, কিন্তু বর্তমানে এটি মাদকের একটি অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের চেয়ে কারাগারের ভেতরে মাদক পাওয়া সহজ, যদিও এর দাম কয়েক গুণ বেশি। কারারক্ষী ও অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় ভেতরে ইয়াবা, গাঁজা ও হিরোইন পৌঁছে যাচ্ছে। যারা সুস্থ অবস্থায় কারাগারে প্রবেশ করেন, জনাকীর্ণতা ও মানসিক চাপের মুখে পড়ে তারা অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। ফলে কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা সুস্থ জীবনে ফেরার বদলে আরও অন্ধকারের দিকে পা বাড়ায়। এই বিষাক্ত চক্র বন্ধ করা না গেলে কারাগার কখনোই মানুষকে সংশোধন করতে পারবে না। 

কারাগারে বন্দি বিভাজন বা ডিভিশন ব্যবস্থা নিয়ে এক গভীর বৈষম্য বিদ্যমান। প্রভাবশালীরা জেলের ভেতরেও আয়েষী জীবন কাটান, অথচ সাধারণ কৃষক বা দিনমজুর বন্দিরা ন্যূনতম মানবিক সম্মান থেকেও বঞ্চিত। আইনি সহায়তার অভাবে হাজার হাজার বন্দি বছরের পর বছর হাজতবাস করছেন যাদের মামলার কোনো কূল-কিনারা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগারকে যন্ত্রণার ঘর থেকে সংশোধনের কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হলে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক মানসিকতা ও আইনি কাঠামো পরিবর্তন।

মানবকণ্ঠ/আরআই