Image description

দেশ কি আবার কুপি-হারিকেনের যুগে ফিরে যাচ্ছে? প্রশ্নটি এখন আর কেবল আবেগের নয়, বাস্তবতারও প্রতিফলন। ঘন ঘন লোডশেডিং, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীনতা এবং অনিশ্চিত সরবরাহ দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যা অতীতের অন্ধকার সময়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। বিদ্যুতের প্রসার সেই অন্ধকার দূর করে মানুষের জীবনযাত্রাকে করেছে সহজ, গতিশীল ও উৎপাদনমুখী।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা যেন আমাদের আবারও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিং, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখন দেশের সর্বত্রই এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং, কোথাও আবার টানা দুই-তিন দিন বিদ্যুৎহীনতা এ যেন এক নীরব সংকট। রাজধানী ও শহর এলাকাও এর বাইরে নয়। দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।

এই সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। জ্বালানি নির্ভরতার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের বিদ্যুৎ খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলেই জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবও বড় সমস্যা। বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিলের কারণে অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বাস্তবায়নে দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তার অর্ধেকও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যা পূরণ করতে হচ্ছে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে। এই সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

কৃষিতে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ঝুঁকির মুখে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আর তীব্র গরমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বকেয়া সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়।

তৃতীয়ত, উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে বাস্তব সরবরাহের সমন্বয় ঘটাতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্ধকারে ফিরে যাওয়ার এই আশঙ্কা কেবল একটি খাতের সংকট নয়; এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। তাই এখনই বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে “কুপি-হারিকেনের যুগে ফিরে যাওয়া” কথাটি আর রূপক থাকবে না, বরং কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সংকট অস্বীকার না করে তা স্বীকার করে সমাধানের পথে এগোতে হবে। বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়, এটি অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের প্রাণশক্তি। এই খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি নচেৎ উন্নয়নের গতিধারা থমকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।