সুনামগঞ্জের হাওর যেন খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু সেই খাদ্যভাণ্ডার এবার উজাড় করেছে বৃষ্টি। এবার অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাওরে কৃষকদের স্বপ্নের সলিল সমাধি হয়েছে। একমাত্র ফসল হারানোয় হাওরের কৃষক আজ বাকরুদ্ধ।
এবার জেলার ১২টি উপজেলার ১৯৯টি ছোট বড় হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৩ হাজার ৭২৪ মেট্রিকটন ধান। যার বাজার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বললেও কৃষক নেতারা বলছেন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। একদিকে ধান কাটার যন্ত্র হারভেস্টার পানিতে চলছে না। অন্যদিকে রয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। যদিও মাঝে মধ্যে ধানকাটার শ্রমিক পাওয়া যায়, তদের মজুর খুব বেশি। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য শস্যে উদ্বৃত্ত এ জেলার কৃষকরা এ বছর খোরাকি গোলায় তোলার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন।
এদিকে, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভারীবৃষ্টিপাত থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা কৃষকদের শঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কোন কোন কৃষক কিছু পরিমান জমির ধান কাটলেও টানা বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা ধান শুকাতে না পারায় নতুন ধানে ধান বীজে চারা অঙ্কুরিত হচ্ছে। জেলার ১২টি উপজেলায় সাড়ে ৮শত হারভেস্টার ধান কাটছে বলে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দাবি করলেও কৃষকরা বলছেন হারভেস্টার পানিতে নেমে ধান কাটতে পারে না। কৃষকরা আরও জানান, জেলার দিরাই, শাল্লা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার বিশাল বিশাল হাওরের পাকা ও আধাপাকা ধান এখন বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত। এসব বিশাল হাওরে নৌকা দিয়ে ধান কাটার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষায় এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার বড় ৫৩টি হাওরের ৬০৩ কিলোমিটার বেরীবাঁধে ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করছে। এসব বাঁধ নির্মনে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও বরাদ্দ এসেছে ৬৭ কোটি টাকা। সূত্র আরও জানায়, মার্চ মাসে সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ মিলিমিটার গড় বৃষ্টিপাত হলেও এবার মার্চ মাসে ২৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়াও সাধারণত এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এবার এপ্রিল মাসে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩৮৯ মিলিমিটার, দিরাইয়ে ৩২৪ মিলিমিটার, ছাতকে ৩৮৮ মিলিমিটার, তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড়ে ৪৪২ মিলিমিটার ও ধর্মপাশা উপজেলার মহেশখলায় ৪০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত অনেক বেশি।
জেলার শাল্লা উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুস ছত্তার মানবকণ্ঠকে জানান, এবার তিনি একশ কেদার (৩০ শতকে এক কেদার) জমি চাষাবাদ করেছেন। ফলনও ভাল হয়েছিল। তিনি ২০ থেকে ২৫ কেদার জমির ধান কেটেছেন। মাড়াই করার আগেই ধানে পচঁন ধরেছে।
তাহিরপুর উপজেলার ভাটিতাহিরপুর গ্রামের গ্রামের কৃষক রাজ কৃমার দেবনাথ মানবকণ্ঠকে জানান, গ্রামের পার্শ্ববর্তী শনি হাওরে এবার তিনি ১২ কেদার জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। জমির ধানা কেটে মাড়াই করেছেন। মাত্র কেদার জমির ধান শুকাতে পেরেছেন। বাকি ১০ কেদার জমির ধানে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে চারা গজিয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক গ্রামের সম্ভ্রান্ত কৃষক রইছ উদ্দিন চৌধুরী(৭৬) মানবকণ্ঠকে জানান, এবার তিনি পাগনার হাওরে ৬৫ কেদার জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। ২০ কেদার জমির ধান কাটলেও রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছেন না। ফলে মাড়াই কলা ধানে বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে। ৪৫ কেদার জমির পাকা ধান বৃষ্টির পানিতে হাওরে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া মানবকণ্ঠকে জানান, এবার তিনি দেখার হাওরে ২৫ কেদার জমি চাষ করেছেন। ধান পেকেছে। কেদার জমির ধান কেটে মাড়াই দিয়েছেন। ওই ধানে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। শান্তনার জন্যই ধান শুকাচ্ছেন।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক রমজান আলী মানবকণ্ঠকে জানান, খরচাও হাওরে তিনি ৬ কেদার জমি চাষ করেছেন। দেড় কেদার জমির ধান কেটেছেন। মাড়াইকলা ধানে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। বাকি ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার মানবকণ্ঠকে জানান, এ বছর জেলার ৫৩ হাওরের ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ৬০৩ কিলোমিটার বাধ নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় সুনামগঞ্জে এবার মার্চ ও এপ্রিল মাসে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানিতে হাওর, খাল-বিল ভরে গেছে। এ কারণে বৃষ্টির পানিতে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক মানবকণ্ঠকে জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে প্রতিটি উপজেলার হাওরের নিচু জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ওমর ফারুক আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করতে ইউএনও, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পিআইও-দেও দিয়ে কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। ওই কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা জেলায় জমা দেবেন। জেলা সেগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।




Comments