বেসরকারি কোম্পানি ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেডের’ সহযোগিতায় বছরের পর বছর শত শত কোটি টাকা লোপাট করে আসছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের একটি অসাধু চক্র। প্রতি মিনিটে তারা অবৈধ পন্থায় সরিয়ে নিচ্ছে ১০ হাজার টাকা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ‘ইউনিফাইড টোলসিস্টেম-ইউটিএস’ সার্ভার লগইন করে ডাটাবেজে আর্থিক লেনদেনের তথ্য মুছে ফেলার কাজ করছে চক্রটি।
অথচ এসব সফটওয়্যার পরিচালনার কথা সড়ক বিভাগের নিজস্ব কর্মকর্তাদের দিয়ে। কিন্তু কোন প্রকার চুক্তি ছাড়াই বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে মূল সফটওয়্যারগুলোর সার্ভারে লগইন করে টোল আদায়ের স্পর্শকাতর তথ্য মুছে ফেলার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। যে কারণে চার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত ৬৭টি টোল থেকে আদায় করা শত শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
এদিকে সড়ক বিভাগ রেগনামের কাছ থেকে টোল আদায়ের আউটর্সোসিং জনবলের নামে তাদের কর্মী দিয়ে কাজ করাচ্ছে যার প্রমাণ মানবকণ্ঠের হাতে রয়েছে। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে সড়ক বিভাগের পদস্থ একজন সাবেক ও কয়েকজন বর্তমান কর্মকর্তা অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে টোল আদায়ের এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করে গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়।
সড়ক বিভাগের একটি সূত্র বলছে, রেগনাম রিসোর্সেস ছাড়া টোল আদায়ের জন্য আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে আর কোন কোম্পানির টোল আদায় করতে পারেনা। অন্য যেসব কোম্পানির নামে টোল আদায় করা হয় সেগুলোও এই চারটি কোম্পানিরই সিস্টার কনসার্ন। এসব ছোট ছোট কোম্পানির পরিচালনা পরিষদে যারা আছেন, তারা মূল চার প্রতিষ্ঠানের মনোনীত ব্যক্তি।
মানবকণ্ঠের অনুসন্ধানে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। একই কোম্পানি আলাদা আলাদা নামে রেজিষ্ট্রেশন করে কাজ করছে। সড়ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমদের লোকবল সংকটের কারণে আমরা জনবল বাইরে থেকে হায়ার করি। তাতে রেগমানেরও কিছু জনবল রয়েছে। মানবকণ্ঠের মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে।
এবিষয়ে সড়ক বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস আল-আমিন বলেন, আমরা রেগমানের সাথে কোন কাজ করছি না। এটা সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের দায়িত্ব। তারা সেটা জানে। আমরা এখান থেকে শুধু মনিটরের দায়িত্ব পালন করে থাকি। কিন্তু প্রতিবেদকের সঙ্গে এই কথা বলার পরের দিনই রেগমানের সাথে আল-আমিনসহ সড়ক বিভাগের একটি মিটিং হয়েছে এ বিষয় নিয়ে।
সড়ক বিভাগের শত শত কোটি টাকার টোল লোপাট সহযোগিতাকারি রেগমান রিসোর্সকে এরই মাঝে ২৫ এপ্রিল আবার নতুন করে আত্রাই টোল প্লাজার টোল আদায়ের কাজ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর পূর্বে রেগনাম রিসোর্স সীতাকুণ্ড (বড় দারোগাহাট), মানিকগঞ্জ (বাথুলি), নেত্রকোনা (জারিয়া), চরসিন্দুর, কুমারখালীর (ফরিদপুর) টোল প্লাজায় আদায়কৃত টাকার হিসাব সফটওয়্যার থেকে রেকর্ড মুছে দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে। এছাড়াও সড়ক বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে লেন দিয়ে যাওয়া গাড়ির টোলের টাকার অংকের পরিমাণ কমিয়ে ইনপুট দেয়া হয়েছে সফটওয়্যারে।
দেশের অন্তত ৬৭টি সেতু ও সড়কের টোলের মাঝে ৪০টির অধিক টোলের এমন তথ্য প্রমাণ মানবকণ্ঠের হাতে এসেছে। যার মাঝে একটি টোলের এক লেনের ১০ মিনিটের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিলেন থেকে ১০ মিনিটে ১৯০ টাকার টোল সফটওয়্যারে কম ইনপুট দেয়া হয়েছে এবং সাথে তথ্য ডিলিটের প্রমাণ ও রয়েছে।
পরের দিন ডিডিতেও সেই টাকা জমা দেয়া হয়নি। দেশে ৬৭টি সেতু ও মহা-সড়কের টোল প্লাজায় সর্বনিন্ম ৪টি থেকে ৯টি পর্যন্ত লেন রয়েছে। কিছু সেতু ও সড়কে দুপাশ মিলিয়ে ২০টির অধিক লেন রয়েছে। ৬৭টি টোল প্লাজায় ৫৫০টির বেশি লেন রয়েছে। প্রতিটি লেনে ১০ মিনিট ১৯০ টাকা টোলের হিসাব দেয়া হচ্ছে না সরকারকে। এখান থেকে প্রতি ১০ মিনিটে ১ লাখের অধিক টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে ১০ হাজার টাকা সরিয়ে নেয়া হচ্ছে অবৈধ পন্থায়।
এ বিষয়ে রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে সড়ক বিভাগ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সে প্রেক্ষিতে আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। দুর্নীতির বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। এ বিষয়ে সড়ক বিভাগই ভালো বলতে পারবে।’
গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন টোল প্লাজার ভিডিও ফুটেজ, টাকা আদায়ের সার্ভারভিত্তিক ছবি, লেনভিত্তিক ডিটেইল্স ট্রানজেকশন রিপোর্ট, টাকা জমাদানের ডিডির কপি ও তথ্য মুছে ফেলার প্রমাণ মানবকণ্ঠের হাতে এসেছে। ২৫ ডিসেম্বর সকাল ৮টা ৫২ মিনিট ৪ সেকেন্ড থেকে শুরু করে ৮টা ৫৯ মিনিট ২২ সেকেন্ডের মধ্যে মোট ১৪টি গাড়ি টোল আদায়ের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই সময়ের মাঝে টোল প্লাজা অতিক্রম করা ১৪টি গাড়ির ৪টি গাড়ি অন্য সার্ভারে তথ্য জমা হয়েছে। বাকি ১০টি গাড়ির টোল আদায়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৭১৫ টাকা কিন্তু এই সময়ের মাঝে ১০টি গাড়ি থেকে টোল আদায় হয়েছে ৯০৫ টাকা। এখানে ১০ মিনিটে ১৯০ টাকার অনিয়ম করা হয়েছে।
আত্রাই টোল প্লাজার ৪নং লেন দিয়ে সকাল ৮টা ৫২ মিনিট ৪ সেকেন্ডে একটি হেভি ট্রাক যায়। যার ট্রাকিং নং-(৭৭৪২০২২৫১২২৫০৮৫২০০৯৮০) এবং রেজি নং-ঢাকা মেট্রো-ইউ-১২-৪০১৯, আদায়কৃত টোলের পরিমাণ ১৫০ টাকা। পরের গাড়ি আইটেম পিকাপ/জিপ/রেকার/ক্রেন। যার প্রতিটি গাড়ির সরকারি রেট নির্ধারণ করা আছে ৬০ টাকা। কিন্তু এখানে তিনটি গাড়ি থেকে ৬০ টাকা করে উত্তোলন করা হলেও সার্ভারে প্রতিটি ৪৫ টাকা করে এন্ট্রি দেয়া হয়েছে। আরেকটি গাড়ি অতিক্রম করেছে ৮টা ৫২মি. ৩৬ সে.। যার ট্রাকিং নম্বর (৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫২৩০৪৫০)। অপর দুটি গাড়ি ৮টা ৫৫মি. ২৭ সেকেন্ডে যায়। যার ট্রাকিং নম্বর (৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫৫২৫২৮২)।
এছাড়া ৮টা ৫৫মি. ৪৮সে. ট্রাকিং নম্বর (৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫৫৪৩৩৩৭), ৮টা ৫৬ মি. ৪৪ সে. একটি মাইক্রো বাস অতিক্রম করে যার ট্রাকিং নম্বর (৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫৬৪০৫৪৭)। একটি মাইক্রো বাসের সরকারি টোল ৬০ টাকা, কিন্তু এখানে দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০ টাকা। অর্থাৎ অর্ধেক টাকাই গায়েব করা হয়েছে। এর পরে ৮টা ৫৭মি. ৫৭ সে. একটি বড়বাস টোল প্লাজা অতিক্রম করেছে। যার ট্রাকিং নম্বর (৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫৭৫৪১৬৫)। এই গাড়ির সরকারি নির্ধারিত টোলের পরিমাণ ১৩৫ টাকা। কিন্ত এখানে শুধু ৬০ টাকা সার্ভারে দেখানো হয়েছে। এর পরে সকাল ৮টা ৫৮মি. ৪ সে. ও ৮টা ৫৯ মি. ২২সে. ট্রাকিং নম্বর (৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫৮৪১৮০৪ ও ৭৭৪২০২৫১২২৫০৮৫৯১৯৯৪৪) দুটি স্যান্ডি কার টোল প্লাজা অতিক্রম করেছে। একটি স্যান্ডি কারের সরকারি নির্ধারিত টোলের পরিমাণ ৪০ টাকা কিন্তু এখানে সার্ভারে দেখানো হয়েছে মাত্র ২০ টাকা করে। এভাবেই প্রতিনিয়ত টোলের টাকা গায়েব করে ফেলছে সংশ্লিষ্ট চক্রটি।
আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সফটওয়্যার ভিত্তিক এই দুর্নীতি শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে রেগনামরি সোর্সের জালিয়াতি, প্রতারণা ও আত্মসাতের ঘটনা আড়ালে রয়ে গেছে। কোথায়, কীভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে-সেই খবর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নেই। জানা গেছে, সড়ক ও সেতু দপ্তরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে হাত করে রেগনাম চুরি করছে এই অর্থ। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পদস্থ কয়েক জন কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকায় রেগনামের মতো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে শত শত কোটি টাকার টোল চুরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
আর ইলেকট্রনিক টোলকালেকশন (ইটিসি) সিস্টেমের আওতায় দেশের অন্তত ৬৭টি সেতুর অধিকাংশেরই টোল আদায় হচ্ছে‘ ইউনিফাইড টোলসিস্টেম’ সফটওয়্যার দিয়ে। সফটওয়্যারটি অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমের (সিএনএস) নিকট হতে ক্রয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক বিভাগের সংশিষ্ট কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে আত্রাই টোল প্লাজার দায়িত্বে থাকা নাটোর সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান সরকারের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সফটওয়্যার রিলেটেড কোন কাজের প্রয়োজন হলে আমরা হেড অফিসকে জানাই। তারা আমাদের এখানে লোক পাঠায়।
তবে সব সময় আমরা দেখেছি রেগনাম রিসোর্সের লোকজনকেই আমাদের এখানে পাঠানো হয়। টাকার হিসাব গড়মিলের বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুল হাসান বলেন, আমাদের এখানে কোন টাকার হিসাবে গড়মিল নেই। আপনি এসে দেখে যেতে পারেন। মানবকণ্ঠের কাছে ভিডিও, ছবি, টাকা জমাদানের ডিডির নম্বরসহ প্রমাণ আছে বলে তাকে জানানো হলে তিনি আর কথা না বলে ফোন কেটে দেন।
সড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট (অ.দা.) মো. আহসান হাবিব মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে আমাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছে। আমি সিভিল বিষয়ে কাজ করি। সফটওয়্যারের বিষয়ে আমার তেমন জানা নেই। তিনি বলেন, আমি দুইবার এখান থেকে দায়িত্ব অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দিয়েছি। আমাকে এরপরেও এখানে রাখা হয়েছে। তবে আপনাদের কাছে এসব অনিয়মের যদি কোন প্রমাণ থাকে তাহলে দিয়ে যান, আমরা সেটা ক্ষতিয়ে দেখব।’




Comments