দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব:
শিশুদের পাশাপাশি ঝুঁকিতে গর্ভবতী নারীরা, দৈনিক গড় মৃত্যু ৭
দেশে সাম্প্রতিক হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। শুধু শিশুরাই নয়, আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসে এখন বড়রাও, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা এই সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৭ জন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে এবং সহস্রাধিক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে হামের সংক্রমণ গর্ভস্থ শিশুর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আক্রান্ত হচ্ছে পুরো পরিবার:
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রুমানা আক্তার (ছদ্মনাম) সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সম্প্রতি তার পাঁচ বছরের ছেলে হামে আক্রান্ত হয়। ছেলেকে সেবা করতে গিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই রুমানাও জ্বর ও শরীরে লালচে দানা নিয়ে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের থেকে পরিবারের বড়দের মধ্যে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মঙ্গলবার (১২ মে) পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৬ হাজার ৮৮১ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪২৪ জনের। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
গর্ভবতী নারীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি:
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রিয়াজ মোবারক জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হামে মৃত্যুঝুঁকি কম হলেও গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তিনি বলেন, “গর্ভাবস্থায় হামের সংক্রমণ হলে গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি, হৃদরোগ, শারীরিক বিকলাঙ্গতা কিংবা কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি গর্ভপাতের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা সুমি বলেন, “গর্ভবতী নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। তাই হামের উপসর্গ দেখা দিলে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”
কেন এই প্রাদুর্ভাব?
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, সময়মতো হাম-রুবেলার টিকা (৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে) না নেওয়া এবং ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ায় সংক্রমণের হার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সরকারি উদ্যোগ:
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন:
১. আক্রান্ত ব্যক্তিকে বা শিশুকে আলাদা কক্ষে রাখতে হবে।
২. গর্ভবতী নারীদের আক্রান্তদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে।
৩. ঘরের বাইরে বা আক্রান্তের কাছে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
৪. জ্বর, কাশি বা শরীরে দানা দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আশা, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির প্রভাবে সংক্রমণের হার আগামী এক মাসের মধ্যে কমতে শুরু করবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সচেতনতা ও সঠিক সময়ে টিকাদানই প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।
সূত্র: বাংলানিউজ২৪




Comments