মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বরেণ্য রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজা তার জন্মভূমি ভোলায় সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এই জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা ও বিদায় জানাতে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হন, ফলে পুরো দ্বীপজেলায় শোকের আবহ তৈরি হয়।
জানাজা শুরুর আগে তোফায়েল আহমেদকে রাষ্ট্রীয় মর্যদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ সময় তার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এর আগে দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে একটি হেলিকপ্টারযোগে তার মরদেহ ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হেলিপ্যাডে আনা হয়। সেখান থেকে ফ্রিজিং ভ্যানে করে মরদেহ নেওয়া হয় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে।
প্রিয় নেতাকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি যখন হেলিপ্যাডে নামে, তখন সেখানে আগে থেকে ভিড় করা কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর সাক্ষী ও কারিগর। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই রাজনীতিক ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালীন তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান সফল করেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ‘মুজিব বাহিনী’র পশ্চিমাঞ্চলীয় চার অধিনায়কের একজন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী জীবনে তিনি মোট ১২টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে জয়লাভ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে তিনি যথাক্রমে শিল্প ও বাণিজ্য এবং পুনরায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।
জানাজা শেষে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ তার পৈতৃক গ্রাম সদর উপজেলার দক্ষিণ দীঘলদি ইউনিয়নের কোড়ালিয়ায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই এই বর্ষীয়ান জননেতাকে সমাহিত করা হয়েছে।
তার মৃত্যুতে ভোলার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। জানাজায় উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা তাকে ‘ভোলার অভিভাবক’ হিসেবে অভিহিত করে স্মৃতিচারণ করেন।




Comments