গণপূর্ত অধিদপ্তরের কার্যক্রমে গতি বাড়াতে গত বছর নতুন সেটআপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা কাটাছেঁড়ার পর ৭ আগস্ট ৩১১টি পদ সৃজনে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সম্মতি জ্ঞাপন করে। কয়েকটি জেলা সদরে ইলেকট্রো মেকানিক্যালের ডিভিশনও অনুমোদন পায়। এরপর অনুমোদিত পদগুলোতে পদোন্নতি ও পোস্টিং দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত নবসৃষ্ট পদে যোগদানকারী কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা তো দূর, বসার চেয়ার পর্যন্ত পাচ্ছেন না। এমন অবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে ৪৯৫/৪৯৬টি নতুন অফিস স্থাপন করে আবারও একটি নতুন সেটআপের আবেদন করা হয়েছে অধিদপ্তর থেকে।
এতে যারপর নাই রুষ্ট হয়েছেন খোদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারিরাও। যেখানে আগের সেটআপের কর্মকর্তারাই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না সেখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নতুন সেটআপের উদ্যোগকে ‘কান্ডজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে প্রকৌশল সেবা সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় প্রতিটি উপজেলায় নতুন করে গণপূর্ত অফিস স্থাপন কতটা বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক?
তারা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন ব্যয়ের পুনঃসমন্বয় এবং সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় এখন অধিকতর সতর্কতা প্রয়োজন। এ অবস্থায় প্রশাসনিক পুনর্গঠন বা নতুন দপ্তর সৃষ্টির মতো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
সূত্র জানায়, গত ১৩ এপ্রিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে পদায়ন করে উপজেলা পর্যায়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি চাওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ‘এলোকেশন অব বিজনেজ’ অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নসহ সরকারি ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যমান স্থাপনাসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামত কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। সময়ের সঙ্গে কাজের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের জনবল বৃদ্ধি পায়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে মাঠ পর্যায়ে ১০টি সিভিল ও ৩টি ই/এম জোন (বিভাগীয় পর্যায়ের সমতুল্য) ও গণপূর্ত সদর দপ্তরে ৪টি, সর্বমোট ১৭টি জোন রয়েছে। প্রতিটি জোনের অধীনে রয়েছে এক/একাধিক সার্কেল (আঞ্চলিক পর্যায়)।
মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি সার্কেলের অধীনে রয়েছে একাধিক বিভাগ (জেলা পর্যায়) এবং প্রতিটি বিভাগের অধীনে একাধিক উপ-বিভাগ রয়েছে। এই বিভাগ ও উপ-বিভাগসমূহ জেলা সদর থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, যার ফলে দূরবর্তী উপজেলাসমূহে কাজ তদারকি কষ্টসাধ্য ও বায়বহুল হয়ে পড়ে। সামগ্রিকভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য উপজেলা পর্যায়েও সেট-আপ এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘উপজেলা পর্যায়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার, অফিস সহায়ক, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান এবং এসি মেকানিক পদে পদায়ন করা হলে কাজের গুণগত মান অক্ষুন্ন রেখে টেকসই নির্মাণ কাজ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এজন্য ন্যূনতম সর্বমোট এক হাজার ৪৭৫টি পদ প্রয়োজন। তবে বিদ্যমান জনবল কাঠামো হতে বিভাগীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তর হতে আপাতত ২৭৩ জন ও মাঠ পর্যায় হতে ২২২ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং ৪৯৫ জন অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বা সম পর্যায়ের কর্মচারী নিয়ে পুনঃবিন্যাসের মাধ্যমে ৪৯৫টি উপজেলায় প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে পদায়ন করে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। এ ব্যবস্থাপনায় উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন করে পদ সৃষ্টির প্রয়োজন আপাতত নেই।’
নতুন সরকারের যাত্রার মাত্র দুই-আড়াইমাসের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এমন উদ্যোগের সমালোচনা করছেন প্রকৌশল সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে ইতোমধ্যেই একাধিক প্রকৌশল দপ্তর বিদ্যমান। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এসব দপ্তরের উপজেলা পর্যায়ে অফিস, কর্মকর্তা, কারিগরি জনবল এবং অবকাঠামো ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভবন নির্মাণ, মেরামত ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ অবস্থায় আবার নতুন করে প্রতিটি উপজেলায় পৃথক গণপূর্ত অফিস স্থাপন করলে প্রশাসনিক কাঠামো আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। সেইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাদের মতে, প্রতিটি উপজেলায় নতুন গণপূর্ত অফিস স্থাপন মানে শুধু একটি সাইনবোর্ড স্থাপন নয়। এর সাথে যুক্ত হবে— নতুন অফিস ভবন, আসবাবপত্র, যানবাহন, অফিস পরিচালনা ব্যয়, বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, সহায়ক জনবল, আইটি ও কারিগরি সরঞ্জাম। অর্থাত্ নতুন ৪৯৫/৪৯৬টি অফিস স্থাপন রাষ্ট্রীয় পরিচালন বাজেটের উপর দীর্ঘমেয়াদি বিরাট চাপ সৃষ্টি করবে।
এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে অন্যান্য প্রকৌশল দপ্তরে সাধারণত ৬ষ্ঠ বা ৯ম গ্রেডের প্রকৌশলীগণ দপ্তরপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের অধীনে একাধিক উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও সহায়ক জনবল থাকে। যদি প্রস্তাবনা অনুযায়ী নতুন গণপূর্ত অফিসে ১০ম গ্রেডের উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে দপ্তর প্রধান করা হয়, তাহলে প্রশাসনিক সমন্বয়, আন্তঃদপ্তর যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
এসব বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাতে পাওয়া যায়নি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) সারোয়ার আলম বলেন, ‘অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে, তবে এটি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারের বিষয় না। মন্ত্রণালয় তাদের কাছে এর যৌক্তিকতা জানতে চাইতে পারে, তারা যদি যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারে তাহলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রশাসনিক উন্নয়ন কমিটি, অর্থ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের বিষয় আছে। তাই এটি লম্বা একটি প্রক্রিয়া। চাইলেই হয়ে গেল তেমন বিষয় না।’
তিনি বলেন, ‘এখন উপজেলা পর্যায়ে প্রচুর সরকারি কাজ হচ্ছে। এগুলোর কোনটি এলজিইডি, কোনটি শিক্ষা প্রকৌশল ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর করছে। আবার উপজেলা-পৌরসভা পর্যায়ের অনেক কাজের জন্য গণপূর্তের কাছেও যেতে হয়, সেক্ষেত্রে হয়তো প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু এটি চাইলেই ১/২ বছরের মধ্যে হয়ে যাবে এমন কোন বিষয় না।’




Comments