Image description

পহেলা মে মানেই অধিকার আদায়ের এক অমর ইশতেহার। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর সেই রক্তাক্ত মে দিবসের পর কেটে গেছে দেড়শ বছরেরও বেশি সময়। আজও কি শ্রমিকের ঘাম আর রক্তের দামে কেনা ‘আট ঘণ্টা’র অধিকার সুরক্ষিত? শিকাগোর সেই ধোঁয়াটে কলকারখানা থেকে আজকের সিলিকন ভ্যালির কাঁচঘেরা অফিস; শ্রমের রূপ বদলেছে, বদলেছে শোষণের ধরন। 

২০২৬ সালের এই মে দিবসের সকালে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে এক নতুন ও অমোঘ বাস্তবতার নাম চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। এখনকার লড়াইটা আর কেবল কলকারখানার লোহা-লক্কড় কিংবা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই। এখনকার চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি সূক্ষ্ম, গাণিতিক এবং যান্ত্রিক। যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রোবোটিক্স আমাদের জীবনের প্রতিটি কোষে প্রবেশ করছে, তখন শ্রমিকের পেশি শক্তির চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার অস্তিত্বের সংকট। হাতুড়ি আর কাস্তের সেই ধ্রুপদী লড়াই আজ কোডিং আর অ্যালগরিদমের গোলকধাঁধায় বন্দি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত, কিন্তু সেই দিগন্তের আড়ালে কি চাপা পড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের ন্যূনতম অধিকার আর সামাজিক নিরাপত্তা? আজকের লড়াইটা আর কেবল কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আজকের লড়াই অস্তিত্বের, আজকের লড়াই যন্ত্রের দাপটে মানুষের টিকে থাকার। একটি বাস্তব উদাহরণের দিকে তাকানো যাক। 

সাভারের একটি পোশাক কারখানায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সুনিপুণ হাতে সেলাই মেশিনের চাকা ঘুরিয়েছেন মরিয়ম বেগম। সেই উপার্জনেই বড় হয়েছে তার সন্তান, চলেছে সংসার। কিন্তু গত বছর সেই কারখানায় বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ‘রোবোটিক স্যুয়িং আর্ম’। যে কাজ আগে দশজন মরিয়ম করতেন, এখন তা একটি যান্ত্রিক হাত অবলীলায় করে দিচ্ছে। মরিয়মের সেই দক্ষ হাতের ছোঁয়া আজ যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের কাছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে পড়েছে। এটি কেবল মরিয়মের গল্প নয়; এটি আজকের বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের রূঢ় বাস্তবতা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যখন উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, তখন অন্যদিকে আমাদের মরিয়মদের ঠেলে দিচ্ছে চরম অনিশ্চয়তার দিকে। আমরা যখন উন্নয়নের বড় বড় সূচক নিয়ে গর্ব করি, তখন যান্ত্রিকতার আড়ালে চাপা পড়া এই নিঃশব্দ কান্নাগুলো কি আমাদের কানে পৌঁছায়?

বর্তমান শ্রমবাজারের আরেকটি অদ্ভুত সংকট হলো ‘ডিজিটাল দাসত্ব’। আমরা এখন গিগ ইকোনমির যুগে বাস করি। স্মার্টফোনের অ্যাপে আঙুলের ছোঁয়ায় ঘরে খাবার পৌঁছানো যুবক কিংবা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাইড শেয়ার করা চালক এরা সবাই আধুনিক শ্রমবাজারের কারিগর। কিন্তু এদের কি কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা আছে? এদের কি কোনো সামাজিক নিরাপত্তা আছে? আপাতদৃষ্টিতে এদের স্বাধীন মনে হলেও, তারা আসলে অ্যাপের অদৃশ্য অ্যালগরিদমের কাছে বন্দি। 

১৮৮৬ সালের সেই সংগ্রামের চেতনা যেখানে ছিল শ্রমের সময় কমানো, ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত সময়টুকুও কেড়ে নেয়া হচ্ছে। ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টফোনের মাধ্যমে একজন কর্মীকে এখন ২৪ ঘণ্টাই কাজের সাথে যুক্ত থাকতে হচ্ছে, যা মে দিবসের মূল দর্শনের সাথে এক চরম বিদ্রুপ। প্রযুক্তির ফলে উৎপাদনশীলতা কয়েকগুণ বাড়লেও লভ্যাংশের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে পুঁজিবাদের হাতে। সাধারণ শ্রমিকের মজুরি সেই অনুপাতে বাড়ছে না। 

ফলে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আরও প্রকট হচ্ছে। তবে আমরা কি প্রযুক্তির বিরোধিতা করব? মোটেও না। সভ্যতার চাকা ঘোরানোর জন্য প্রযুক্তির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যন্ত্র আসুক, সভ্যতা আরও আধুনিক হোক, কিন্তু সেই প্রযুক্তি যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে মানুষের ‘সহযোগী’ হিসেবে আসে। ২০২৬ সালের মে দিবসে আমাদের দাবি হওয়া উচিত প্রযুক্তির লভ্যাংশের সুষম বণ্টন। যদি একটি রোবট দশজন শ্রমিকের কাজ করে, তবে সেই রোবটের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ যেন শ্রমিকের কল্যাণে ও পুনঃপ্রশিক্ষণে ব্যয় করা হয়। 

ডিজিটাল প্লাটফর্মে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নতুন শ্রম আইন প্রণয়ন করা। আমাদের শ্রমিকদের কেবল ছাঁটাই করলে চলবে না, বরং তাদের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির চাবিকাঠি। রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে প্রতিটি শ্রমিককে ডিজিটাল সাক্ষরতায় দক্ষ করে তোলার। ‘স্কিল আপগ্রেডেশন’ বা দক্ষতা বৃদ্ধি যেন কেবল পুঁথিগত শব্দ না হয়ে শ্রমিকের মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়। শিকাগোর সেই তপ্ত রক্ত আজও যেন আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে প্রযুক্তি আসুক মানুষের হাতকে শক্তিশালী করতে, সেই হাতকে কর্মহীন করতে নয়। আর যদি অটোমেশনের কারণে কাজ কমে যায়, তবে রাষ্ট্রকে বিকল্প আয়ের কথা ভাবতে হবে। পরিশেষে এটাই বলতে হয়, ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় শ্রমিক, কোনো যন্ত্র নয়। 

রোবট হয়তো নিখুঁত পণ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই পণ্যে মানবিক স্পর্শ কিংবা হৃদয়ের আবেগ দিতে পারে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক উন্নয়ন যেন কেবল ধাতব যন্ত্রের না হয়, উন্নয়ন যেন হয় মানুষের। শিকাগো শহরের শ্রমিকদের সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়। প্রযুক্তির এই জোয়ারে যেন শ্রমিকের ঘাম আর সম্মান ধুয়ে মুছে না যায়। 

২০২৬ সালের এই মে দিবসে আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হোক প্রযুক্তি আসুক মানুষের কল্যাণে, মানুষের হাত কেড়ে নিতে নয়। পৃথিবীটা মানুষের, আর মানুষের ঘামেই যেন সচল থাকে আগামীর প্রতিটা শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করাই হোক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল দর্শন। পহেলা মে’র রক্তরাঙা সূর্য যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীটা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই হোক, যন্ত্রের নয়। শ্রমিক-মালিক সৌহার্দ্য দীর্ঘজীবী হোক। জয় হোক মে দিবসের চিরন্তন চেতনার।

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক