সামাজিক বৈষম্য দূর করে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জাতির উদ্দেশ্যে নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রোববার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভিতে প্রচারিত ভাষণে তিনি বিগত ৫৫ বছরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্তকে ‘বৈষম্যের কাঠামো’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে একটি ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেন। এসময় তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ভারতের আধিপত্য, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিরোধী ফ্যাসিবাদী শক্তি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির প্রভাব থেকে দেশকে দখলমুক্ত করতে এবং অযোগ্য, অসৎ, লোভী, বেপরোয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের প্রভাব থেকে দখলমুক্ত করতে এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
ভাষণের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মূল অঙ্গীকার ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং বিচার-সব ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই বৈষম্য শুধু আয়ের নয়-ক্ষমতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়ের প্রশ্নেও। জুলাই বিপ্লব পুরনো বন্দোবস্ত ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু সেই ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও নির্বাচনের মাধ্যমে বেইনসাফ রাষ্ট্র ফিরিয়ে আনতে চায়।’
নাহিদ ইসলাম তার ভাষণে গত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে দমন-পীড়ন চালিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু অপরাধী পালিয়েছে, কেউ কেউ বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক খুনি, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। এনসিপি সরকার গঠন করলে গুম–খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা হবে। বাহিনী বা পদমর্যাদা কোনো অপরাধীকে রক্ষা করতে পারবে না।
ভাষণে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে। এই অর্থ জনগণের ছিল, তা লুট করে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এনসিপি ক্ষমতায় গেলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। লুটপাটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর অধীনে আনা হবে, যাতে সেই সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিগত সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছিল। বছরের পর বছর ধরে, সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে ইন্ডিয়ার খুনে বাহিনী বিএসএফ শত শত বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করলেও খুনি হাসিনার সরকার চুপ করে থেকেছে। ফ্যাসিবাদী যুগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট সচিবগণ এবং বিজিবির মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসাররা ইন্ডিয়ার এই অসভ্য মানবতাবিরোধী আচরণের পক্ষে সাফাই গেয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। বাস্তবে তারা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ইন্ডিয়ার পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। তখন ঢাকার এই ফ্যাসিস্ট শাসকরা মনে করত দিল্লি তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের কেন্দ্র। তাদের জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা এবং আত্মমর্যাদাহীন কূটনীতির কারণে দেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, জনগণ এনসিপির ওপর ভরসা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দিলে আত্মমর্যাদাপূর্ণ, স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে। সার্ক পুনর্জীবন, আশিয়ানে যোগদানের প্রচেষ্টা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও স্বল্প খরচে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। যখন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট তৈরির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা এখনও তৃতীয় প্রজন্মের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছি। এনসিপি গুণগত মানসম্পন্ন, প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি ১৮ ঊর্ধ্ব তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি।
লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের জন্য তিনি সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজ ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রকে দায়ী করেন। এনসিপির এ শীর্ষ নেতা বলেন, সরকারে গেলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। এমন দুষ্টু চক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি প্রমাণিত হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। কৃষক যেন মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পণ্য বিক্রি করতে পারে এবং ভোক্তা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পায়—সে ব্যবস্থার গড়ে তোলা হবে।
ভাষণে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী কার্যত একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মতো পুলিশকেও ‘পুলিশলীগ’ নামে ডাকতে শুরু করেছিল। দেশে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা তখনকার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও পুলিশ ব্যাপক নৃশংসতা করেছে। আমরা সরকার গঠন করলে, জুলাই বিপ্লবের সময় এবং এর পূর্বাপর ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি করে অর্থ লোপাট ও ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল— তাদের প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় আনা হবে। এমন সব বিচার সম্পন্ন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশকে খোলনলচে বদলে পুনর্গঠন করা হবে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় সংকীর্ণ মনোভাবের সংস্কৃতিকে কবর দিয়ে বাহিনীকে জন নিরাপত্তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রথমত, দেশবাসীর মতামত নিয়ে, ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন ও নানান জুলুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ বা অন্যকিছু রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানেই পদায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সমান সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে।
বিচার বিভাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আজ বিচার চাইতে গিয়ে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়। আমরা ক্ষমতায় এলে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিমুক্ত বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
শাসন ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণকে বৈষম্যের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে নাহিদ ইসলাম উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে জনগণের হাতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা দিয়ে জেলা–উপজেলায় ফুড টেস্টিং ল্যাব চালুর প্রতিশ্রুতিও দেন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, পোশাকের স্বাধীনতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার অঙ্গীকার করেন নাহিদ ইসলাম।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে এনসিপির এ নেতা বলেন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও রাজনীতিতে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যখাতে সমস্যা ভবনের নয়, ব্যবস্থাপনার। সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন তিনি।
শিক্ষাখাতে অবকাঠামোর বদলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেন। কৃষকদের ন্যায্য মূল্য, সহজ কৃষিঋণ এবং সিন্ডিকেট ভাঙার কথাও বলেন তিনি। বাংলাদেশকে বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেন নাহিদ ইসলাম। প্রবাসে যাওয়ার খরচ কমিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
নাহিদ বলেন, খুনি হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সময়ে কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি সরকারে না থাকলেও একটি দুর্বৃত্তপরায়ণ দলের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে চাঁদাবাজি, দখল, নিয়োগ–বদলি ও বিচার বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতি চালিয়েছে-যা জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে ভোটাররা বুঝে গেছে, ওই দল ক্ষমতায় গেলে দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।




Comments