Image description

গ্রামের নাম খোলাশ। এই গ্রামটি বগুড়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে দুপচাঁচিয়ার ধাপেরহাটের উত্তরে অবস্থিত। তবে লোকে এই গ্রামকে ‘টমটম গ্রাম’ হিসেবে বেশি চেনে। এ গ্রামের বাসিন্দাদের বানানো খেলনার মধ্যে টমটম গাড়ির আধিক্য এবং দেশব্যাপী সেগুলোর ব্যাপক প্রচলন থাকায় গ্রামটির নাম স্থানীয় লোকজন দিয়েছেন টমটম গ্রাম। 

গ্রাম-বাংলার মেলার মূল আকর্ষণ টমটম খেলনাগাড়ি। গ্রাম্য সাধারণ মানুষের ছেলেমেয়েদের জন্য আকর্ষণীয় খেলনা হিসেবে টমটম গাড়ি সকলের কাছে প্রিয়। যদিও দেশব্যাপী প্রায় মেলাতেই এই টমটম গাড়ি কম বেশি দেখা যায়। যার ঐতিহ্য বহন করে চলছে গ্রাম্যমেলায় গ্রাম্য শিশুরাই।

ছোট ঠেলাগাড়ির আদলে তৈরি এই টমটম খেলনা। গাড়ির ওপরে মাটির একটি বাটি শক্ত কাগজে মোড়ানো। এতে দুটো কাঠি বসানো থাকে। গাড়ির আগা সুতো দিয়ে বাঁধা। ছোট ছেলেমেয়েরা গাড়িটি টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় কাঠি দুটি মাটির বাটিতে বাড়ি খায়। আর টং টং করে শব্দ হয়। এ জন্যই নাম টমটম খেলনা গাড়ি।

বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই টমটম খেলনা গাড়ি বানানো হয়। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় কেবল খোলাশ গ্রামই। এসব খেলনা বানানোকে কেন্দ্র করেই প্রতিটি ঘরে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প। গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবারই খেলনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত।

খেলনা তৈরির কারিগররা একেক জন একেক অংশের কাজ করেন। গড়ে প্রতিদিন ১০০টি খেলনা তৈরি করেন তারা। প্রতিটি টমটম তৈরিতে খরচ পড়ে ৫ টাকা থেকে ৭ টাকা। পাইকারি হিসেবে আট থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে মেলায় বা খুচরা হিসেবে প্রতিটি ১৫ থেকে ২০ টাকা বিক্রি করেন বিক্রেতারা। 

খোলাশ গ্রামের মাটির সারি সারি একতলা-দোতলা বাড়ির গলি দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে গ্রাম-বাংলার মেলায় বহুল প্রচলিত শিশুদের খেলনা রং-বেরঙের টমটম গাড়ি তৈরির দৃশ্য। এছাড়াও চলছে কাঠের গাড়ি, কাঠের চরকা, কাঠের পাখি, কাঠের ট্রাক, বেহালা, সারিন্দা, ঘিন্নিসহ হরেকরকম খেলনা তৈরির উত্সব।

বাড়ির নারী ও কিশোরীদের কাঠিতে রং লাগানো ও কাগজে আলপনা আঁকার আয়োজন বসে প্রতিটি উঠোনে। চলে কাঠ, বাঁশ আর কাগজ দিয়ে শিশুদের এসব খেলনা বানানোর কাজ। বছরজুড়েই এ গ্রামের কারিগররা এসব খেলনা বানিয়ে দেশের বিভিন্ন মেলা ও উৎসবের সময় বিক্রয়ের কাজ করলেও ব্যস্ততা বেশি বেড়ে যায় বাংলা নববর্ষের উৎসব ঘিরে। 

টমটম গাড়ির মাটির খুড়ি ও চাতকি তৈরি হচ্ছে পাশের চেঙ্গাপালপাড়া গ্রামে। সব মিলিয়ে খেলনা তৈরির এ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বিভিন্ন খেলনা বানিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। খোলাশ পূর্বপাড়ার একটি গলি ধরে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল রাস্তার লাগোয়া মাটির বাড়ি। দরজা থেকেই দেখা যায় বাঁশ চিকন করে কাটা। এক পাশে স্তূপ করে রাখা মাটির ছোট বাটি। তিন নারী একত্রে বসে কাজ করছেন। অপরিচিত মানুষ দেখে ঘোমটা একটু টেনেই দিলেন তারা। জিজ্ঞেস করলে বললেন, এ খেলনার নাম টমটম। দেশব্যাপী বিভিন্ন মেলাকে কেন্দ্র করে এগুলো তৈরি করেন তারা। সারাবছর চলে খেলনা তৈরি ও বিক্রি। এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসা।

খোলাশ গ্রামে খেলনা তৈরির ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম অনেককে। সঠিক সময়কাল কেউ ঠিক মতো বলতে পারেন না। তবে প্রবীণ কারিগর ও টমটম ব্যবসায়ী আবেদ আলীর মুখে শুরুর গল্পটা কিছুটা শোনা হয়। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর আগে পাকিস্তান আমলে কুড়ানু নামের এ গ্রামের একজনের হাত ধরে শুরু হয় টমটম খেলনা তৈরি। কুড়ানু ছোট বেলায় হারিয়ে যায়। তাকে খুঁজে পায় সৈয়দপুরের কয়েকজন বিহারী। তাদের কাছে থেকে টমটম খেলনা তৈরি করা শিখে বড় হয়ে গ্রামে ফিরে আসে সে। তখন পরিপূর্ণ যুবক কুড়ানু। গ্রামে এসে শুরু করে টমটম খেলনা তৈরি। তার কাছে থেকেই গ্রামের অন্যরা টমটম বানানো শেখেন।

গ্রামীণ মেলার এখনো প্রধান আকর্ষণ শিশুদের খেলনা টমটম মনে করিয়ে দেয় বাঙালির ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে। বিশেষ করে বাংলা নববর্ষে শহর বা গ্রামে মেলা শুরু হলে দেখা মেলে এ খেলনার।

আসলেই খোলাশ গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে খেলনা তৈরিতে নারীদের হাতের ছোঁয়াই বেশি। ছেলেরা সাধারণত কাঁচামাল ক্রয় করা এবং বাইরে বিক্রির বিষয়টি দেখাশোনা করেন। এই গ্রামের মালেকা নামের এক নারীর সঙ্গে আলাপের এক পর্যায়ে যোগ দেন তার ছেলে ৩১ বছরের জাফর আলী। বাবা কছিম উদ্দিনের হাত ধরে এ পেশায় যুক্ত হওয়া। ১২ বছর বয়স থেকে যেতেন বিভিন্ন মেলায়। বিক্রি করে আবার ফিরে আসেন বাড়িতে। সংসারের খরচ মিটিয়ে আবার নতুন কাঁচামাল ক্রয় করে প্রস্তুত করেন নতুন খেলনা। 

‘নিজে মেলায় নিয়ে গেলে আয় একটু বেশি হয়। দেশের যেখানে মেলা থাকে সেখানে আমরা খেলনা নিয়ে যাই। এভাবে বছরে গড়ে ১ লাখ পিস খেলনা বিক্রি হয়’, বলেন জাফর। 

এ গ্রামের বেশ কয়েকজন আছেন যারা তৈরি খেলনা পাইকারি কিনে দেশের বিভিন্ন জেলা ও মেলায় বিক্রয় করেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী ইনছান বেশ নাম করা। ইনছানের হিসেব মতে, প্রতিবছর গড়ে প্রতি ঘর খেলনার কারিগরেরা বছরে অন্তত ১ লাখ পিস টমটমসহ অন্যান্য খেলনা তৈরি করেন। উত্তরবঙ্গের দিকে কম যান গ্রামের পাইকাররা। চাহিদা ভালো থাকায় তারা সাধারণত খেলনা নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এ ছাড়া বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলেও খেলনা নিয়ে যান পাইকারেরা। এছাড়াও বিভিন্ন জেলা ব্যবসায়ীরা আসেন এই গ্রামে খেলনা ক্রয় করতে। 

ব্যবসায়ীরা জানান, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। এক যুগ আগেও একটি টমটম বিক্রি হতো ৫ থেকে ৭ টাকায়। আর এখন খরচ বেড়েছে। সারাবছর দেশের কোথাও না কোথাও মেলা চলে। আর এ খেলনার চাহিদা থাকায় একটি টমটম বিক্রি হয় গড়ে ২০ টাকা পর্যন্ত। একজন কারিগর সপ্তাহে ৪শ’ টমটম বানাতে পারেন। বৈশাখ মাসে বছরের সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। আর বর্ষার সময় কয়েক মাস বসে থাকতে হয় তাদের। সংসার চালানোর জন্য তাদেরকে অন্য কোনো পেশায় শ্রম দিয়ে যা পান তাই দিয়েই তাদের সংসার চলে। 

ব্যবসায়ীরা বলেন, এখন এ গ্রামের প্রায় সবাই স্বাবলম্বী। কিন্তু কেউ কোনো অর্থকষ্টে পড়লে সমাধান করার কেউ নেই। নিজেদেরই করতে হয়। কোনো ব্যাংক থেকে এসব কুটির শিল্পের নামে কোনো ঋণ পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই বেশি পরিমাণ খেলনা বানানোর পরিকল্পনা করলেও, তা সম্ভব হয়ে উঠে না। অপরদিকে, টমটম গাড়ি বিলুপ্ত হওয়ার পথে থাকলেও শীত মৌসুমে মেলাকে কেন্দ্র করে সচল হয়ে ওঠে খেলনা টমটম গাড়ির বেচা কেনা। 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইংরেজ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে টমটম গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। উনিশশত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ব্রিটিশরা কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সে সময় রাজধানী ঢাকায় সম্ভ্রান্ত লোকদের টমটম ঘোড়ার গাড়িতে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়। সে কারণেই এই টমটম গাড়ি ছিল প্রভাবশালীদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি। 

আজ সময়ের বিবর্তনে শহর থেকে গ্রামে প্রতীকী খেলনা গাড়ি হিসেবে মেলায় স্থান করে নিয়েছে টমটম। গ্রামে কিংবা শহরের সব শিশু-কিশোরদের জন্য এই টমটম গাড়ি খুবই জনপ্রিয় খেলনা। এমন কেউ নেই যে, এই গ্রাম্যমেলার টমটম খেলনা গাড়ির জন্য অতীতে বায়না ধরেননি।


মানবকণ্ঠ/এফআই