Image description

ভালোবেসে বিয়ে, দীর্ঘদিনের সংসার, চার সন্তান—এরপরও শেষ রক্ষা হলো না সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিনের (কেয়া)। ১৩ আগস্ট মধ্যরাতে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় স্বামী সিফাত আলীর হাতে শ্বাসরোধে খুন হন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেন সিফাত। ঘটনার পর ফাহমিদার লাশ হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যান তিনি। এদিকে, সিলেটের গোলাপগঞ্জে স্ত্রী সাবিনা বেগমকে (৩০) হত্যার পর লাশ পুকুরে ফেলে দেন স্বামী আনু মিয়া। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে পারিবারিক সহিংসতায় ৩৬৩টি ঘটনায় ৩২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১৩৩ নারী।

ফাহমিদার হত্যা: আত্মহত্যার নাটক সাজানোর অভিযোগ

রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় ১৩ আগস্ট মধ্যরাতে ফাহমিদার মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, ভালোবাসার বিয়ে করে এক যুগের সংসারে চার সন্তানের জননী ফাহমিদাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন স্বামী সিফাত। তিনি ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেন। ফাহমিদার ফুফা মো. শামসুদ্দোহা খান জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফাহমিদা রান্না করছিলেন। সিফাত বাইরে থেকে এসে তাঁকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে হত্যা করা হয়। রাত ২টার দিকে সিফাত ফাহমিদার পরিবারকে ফোন করে বলেন, “কেয়া খুব অসুস্থ, দ্রুত আসেন।” হাসপাতালে গিয়ে পরিবার দেখে ফাহমিদা আর বেঁচে নেই। সিফাত লাশ রেখে পালিয়ে যান, সন্তানদের বোনের বাসায় রেখে বাসা তালা মেরে চলে যান।

পরিবার পুলিশ নিয়ে বাসায় ঢুকে দেখে, রান্নাঘরে হাঁড়িতে মাংস-মসলা রাখা। শামসুদ্দোহা বলেন, “রান্নার আয়োজন চলা অবস্থায় চার সন্তান রেখে আত্মহত্যা করেছেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।” ফাহমিদার মা নাজমা বেগম মিরপুর মডেল থানায় সিফাতসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তবে এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। মিরপুর থানার ওসি সাজ্জাদ রোমন বলেন, “তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। শিগগির প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হবে।”

সিলেটে পুকুরে লাশ, নারায়ণগঞ্জে তিনজনের হত্যা

সিলেটের গোলাপগঞ্জে গত ১৮ জুন সাবিনা বেগমকে হত্যার পর লাশ পুকুরে ফেলার অভিযোগে স্বামী আনু মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গোলাপগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্যা জানান, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। সাবিনার গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গত এপ্রিলে ইয়াছিন আলী স্ত্রী লামিয়া আক্তার (২৩), সন্তান আবদুল্লাহ রাফসান (৪) ও স্ত্রীর বোন স্বপ্না আক্তারকে (৩৫) হত্যা করেন। পুলিশ জানায়, মাদকাসক্ত ইয়াছিন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে স্ত্রীর বোনের বাসায় গিয়ে গলা কেটে ও শ্বাসরোধে তিনজনকে হত্যা করেন। লাশ বস্তাবন্দী করে মাটিচাপা দেন তিনি।

পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ পরিসংখ্যান

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুসারে, ৭ মাসে ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় ২০৮ নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছেন, ১১৪ জন আত্মহত্যা করেছেন। স্বামীর হাতে ১৩৩, স্বামীর পরিবারের হাতে ৪২ এবং নিজ পরিবারের হাতে ৩৩ জন খুন হয়েছেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ‘১০৯’-এ শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে ৪৮ হাজার ৭৪৫টি। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের কল এসেছে ১৭ হাজার ৩৪১টি, যার মধ্যে পারিবারিক নির্যাতন ৯ হাজার ৭৪৬টি এবং স্বামীর বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৩৯৪টি।

কেন বাড়ছে নির্যাতন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান বলেন, “পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতা নির্যাতন বাড়াচ্ছে। বিয়ের পর নারীদের স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির সব কথা মেনে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। অশিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীরা বেশি নির্যাতিত হন। বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতাও এর কারণ।”

তিনি আরও বলেন, “নারীদের নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও শাস্তির ভয় তৈরি করা জরুরি।”

ফাহমিদার পরিবারের মতো অনেকেই ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সন্দিহান। তাঁরা বলেন, মামলা করতে বেগ পেতে হয়েছে, এবং আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

সমাধানের পথ কী?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারী নির্যাতন রোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, আইনের প্রয়োগ জোরদার করা এবং নারীদের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষমতায়ন জরুরি। পারিবারিক সহিংসতা রোধে হেল্পল