ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে থাকা সর্বশেষ ইসরায়েলি বন্দীর মরদেহের সন্ধান কার্যক্রম শেষ হলে মিশরের সাথে গাজার রাফাহ ক্রসিংটি "সীমিত আকারে" পুনরায় চালু করার অনুমতি দেবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।
রবিবার গভীর রাতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এই ঘোষণাটি আসে। এমন এক সময়ে এই ঘোষণা এলো যখন গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনির মৃত্যুতে শোক পালন করা হচ্ছিল।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, রাফাহ ক্রসিং—যা অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে খোলার কথা ছিল—তা কেবল সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
তবে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই পদক্ষেপটি "সমস্ত জীবিত বন্দীদের মুক্তি এবং মৃত বন্দীদের খুঁজে বের করে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে হামাসের শতভাগ প্রচেষ্টার" ওপর শর্তযুক্ত।
পুলিশ কর্মকর্তা রান গভিলির মরদেহ বাদে বাকি সব বন্দীকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রবিবার জানিয়েছে, তারা উত্তর গাজার "ইয়েলো লাইন" (ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সীমানা) সংলগ্ন একটি কবরস্থানে তল্লাশি চালাচ্ছে। একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গভিলির অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে বেশ কিছু গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
এর আগে রবিবার হামাস দাবি করেছে, তারা "পূর্ণ স্বচ্ছতার" সাথে ইসরায়েলি সেনার মরদেহের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী তাদের সমস্ত বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে।
হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র বলেন, তারা এই ফাইলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কোনো ধরনের কালক্ষেপণে তাদের আগ্রহ নেই। তিনি বলেন, "আমরা মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানাই যেন তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেন এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীকে বাধ্য করেন।"
'কেবল পথচারীদের যাতায়াত'
গাজার ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির জন্য রাফাহ ক্রসিং হলো যাতায়াতের একমাত্র পথ। ২০২৪ সাল থেকে ক্রসিংয়ের গাজা অংশটি ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ক্রসিংটি "উভয় অভিমুখে" খুলে দেওয়ার কথা ছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল ও হামাসের ওপর চাপ বাড়ছে এবং ওয়াশিংটন গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছে যে গাজা পুনর্গঠনের জন্য যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় রাফাহ ক্রসিং পূর্ণাঙ্গভাবে খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও, নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে যে প্রবেশাধিকার "সীমিত" থাকবে এবং এটি "কেবল পথচারীদের যাতায়াতের জন্য, যা ইসরায়েলি পরিদর্শন ব্যবস্থার অধীন" হবে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই পদক্ষেপটি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার দীর্ঘমেয়াদী ইসরায়েলি কৌশলের অংশ হতে পারে।
'দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি'র লেখক অ্যান্থনি লোয়েনস্টাইন বলেন, "মিশরে গত দুই বছর ধরে ইসরায়েলি গণহত্যার কারণে অসংখ্য ফিলিস্তিনি আটকা পড়ে আছেন। তাদের অনেকে ফিরে আসতে চান, কিন্তু ইসরায়েল চায় ফিলিস্তিনিরা যেন গাজা ছেড়ে চলে যায় এবং আর ফিরে না আসে। কেবল পথচারীদের জন্য ক্রসিং খুলে দিলে মিশরে আটকে থাকা টন টন জরুরি মানবিক সহায়তা গাজায় পৌঁছানোর কোনো সমাধান হবে না।"
বৈরুত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশড ফেলো রামি খৌরি এই মত সমর্থন করে বলেন, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র—খাবার, পানি এবং চিকিৎসা—নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তিনি বলেন, হামাস তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেও ইসরায়েল নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না।
এদিকে গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, রবিবার পৃথক দুটি ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন এবং গাজা সিটিতে ড্রোন হামলায় আরও চারজন আহত হয়েছেন।
অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৪ শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত দুই বছরে ইসরায়েলের চালানো এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সব মিলিয়ে ৭১,৬৫৭ জন নিহত এবং ১,৭১,৩৯৯ জন আহত হয়েছেন।




Comments