ইউক্রেনে গত রাতটি অপেক্ষাকৃত শান্তভাবে অতিবাহিত হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহের সময় কিয়েভ এবং অন্যান্য শহরে হামলা না চালাতে রাজি হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ক্রেমলিন নিশ্চিত করেছে যে, শান্তি আলোচনার জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করতে তারা আগামী রবিবার পর্যন্ত কিয়েভে হামলা স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প এই বিরতি কখন শুরু হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে না বললেও, শুক্রবার রাতভর ইউক্রেনের মাত্র আটটি অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কবার্তা বাজানো হয়েছে। জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে সামান্য আহতের খবর পাওয়া গেছে।
আগামী দিনগুলোতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের তাপমাত্রা মাইনাস ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। রাশিয়া সম্প্রতি ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে, যা তারা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি শীতেই করে আসছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এই শৈত্যপ্রবাহের আগে বড় ধরনের রুশ হামলার আশঙ্কা করছিলেন। যদি সেই হামলা না ঘটে, তবে এটি যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টার একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুরোধে পুতিন ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কিয়েভে হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি শৈত্যপ্রবাহের কথা উল্লেখ করেননি এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ থাকবে কি না—তা স্পষ্ট করতে রাজি হননি। বরং তিনি বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনাকে সহজতর করার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন।
রাজধানী কিয়েভে গত কয়েক রাত শান্ত থাকলেও, একটি মনিটরিং সংস্থার তথ্যমতে এই সপ্তাহে সেখানে ৫৩০ বার বিমান হামলার সাইরেন বেজেছে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, গত রাতেও সম্মুখ সারির অঞ্চলগুলোতে ১০০টির বেশি ড্রোন এবং একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হিটিং বা বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
ওয়াশিংটনে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, "আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে অনুরোধ করেছি যেন এক সপ্তাহ কিয়েভ এবং বিভিন্ন শহরে হামলা না করা হয় এবং তিনি তাতে রাজি হয়েছেন। এটি খুবই ইতিবাচক একটি বিষয়। অনেকেই বলেছিলেন এই ফোন করে লাভ হবে না, কিন্তু তিনি (পুতিন) কথা রেখেছেন।" ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, ইউক্রেনীয়রা প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে থাকায় এই খবরে তারা খুব খুশি হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ট্রাম্প একটি "গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি" দিয়েছেন। তবে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি কোনো সংলাপ বা চুক্তি হয়নি। তবে মস্কো যদি হামলা বন্ধ রাখে, তবে কিয়েভও একই পথে চলবে।
এদিকে, কিয়েভের সাধারণ মানুষ এই চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ওলেনা নামে এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, "আমি বিশ্বাস করি না যে পুতিন এক সপ্তাহও থামবেন। এর আগে অনেক আলোচনা ও চুক্তি হয়েছে, কিন্তু তিনি যা চান তাই করেন।"
গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সব পক্ষই আলোচনাকে "গঠনমূলক" বললেও তখন কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির ঘোষণা আসেনি। বর্তমানে কিয়েভের প্রায় ৩৭৮টি বহুতল ভবনে কোনো হিটিং ব্যবস্থা নেই এবং বিদ্যুৎ সরবরাহও খুব সীমিত সময়ের জন্য থাকে।
আগামী রবিবার আবুধাবিতে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে এটি পিছিয়ে যেতে পারে বলে জেলেনস্কি জানিয়েছেন। শান্তি পরিকল্পনার প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে ইউক্রেনের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি। রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ডনবাস অঞ্চলের বাকি অংশও দাবি করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন তার বৃহত্তম জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরত চায়। জেলেনস্কি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "আমরা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে কোনো আপস করতে প্রস্তুত নই। ডনবাস বা জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমরা বিনা যুদ্ধে রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেব না।"
তথ্যসূত্র: বিবিসি
Comments