'ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি ছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময় বলেছিলেন, ফ্যামিলি কার্ড কোনো স্বপ্ন নয়। এটি বিএনপির একটি পরিকল্পনা, যা আমরা বাস্তবায়ন করব। সেই পরিকল্পনা আর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ইতিমধ্যেই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। সরকারি প্রস্তুতিমূলক কাজের মধ্যে রয়েছে কমিটি গঠন, পাইলটিং এলাকা নির্বাচন, ব্যয় নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়ন। এই প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুইদিনের মাথায়ই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় 'ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেন তারেক রহমান। চলতি রমজানেই দরিদ্র পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে ৮ উপজেলায় পাইলটিং শুরু করার নির্দেশনা দেন তিনি। পর্যায়ক্রমে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করার সিদ্ধান্ত জানান।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন:
‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা ১৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়।
কমিটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কমিটির সদস্যরা হলেন- মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী; উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী; মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী; উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন; উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ; মন্ত্রিপরিষদ সচিব; মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব; নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব; অর্থ বিভাগের সচিব; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব; স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব; পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
ফ্যামিলি কার্ডে কি কি সুবিধা থাকবে:
বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, দেশে বর্তমানে চালু থাকা বিভিন্ন কার্ড ও ভাতা কর্মসূচির তুলনায়—ফ্যামিলি কার্ডের আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। তবে বিদ্যমান কার্ড ও ভাতা কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং নতুন ফ্যামিলি কার্ড সর্বজনীনভাবে বিতরণ করা হবে।
প্রস্তাবিত পলিসি পেপার অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া প্রতিটি পরিবার প্রতিমাসে ২৫ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ১ কেজি মসুর ডাল, ২ লিটার ভোজ্যতেল ও ১ কেজি লবণ—অথবা নগদ ২,০০০ টাকা পাবে।
তবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার পণ্য দেওয়ার চেয়ে নগদ টাকা দেওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পাইলট কর্মসূচির এলাকা:
প্রাথমিকভাবে ৮ বিভাগের একটি করে ৮ টি উপজেলা ঠিক করা হয়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে; রংপুর বিভাগে কুড়িগ্রাম সদর; খুলনা বিভাগে শ্যামনগর; সিলেট বিভাগে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই; চট্টগ্রামের লামা উপজেলা; বরিশালের চরফ্যাশন উপজেলা; ঢাকা বিভাগের কেরাণীগঞ্জ উপজেলা, ময়মনসিংহ বিভাগের নান্দাইল উপজেলা এবং রাজশাহী বিভাগের পবা উপজেলা।
এসব উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চলবে ৬ মাস, এতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর পুরোটাই সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে। এসব উপজেলায় দেড় লাখ উপকারভোগী রয়েছে।
কারা পাবেন ফ্যামিলি কার্ড:
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাখতে পরিবারগুলোকে— হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত এই চার শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। অতি দারিদ্র্যপীড়িত, দুর্যোগপ্রবণ ও বস্তি অঞ্চলে বসবাসকারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় উপস্থিত থাকা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, কর্মসূচিটি হবে সর্বজনীন, কোনো বিধিনিষেধ থাকবে না। তবে একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণ শুরু হতে পারে। প্রথমে অতি দরিদ্র, পরে দরিদ্র এবং এরপর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
অর্থায়ন হবে যেভাবে:
দেশে চলমান সমজাতীয় কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ডের সাথে একীভূত করলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা আসবে। এছাড়া অর্থবিভাগের পরিচালন বাজেটের থোক বরাদ্দ থেকে অর্থায়ন করা যাবে। এডিপি পুনর্বিন্যাস ও অব্যয়িত অর্থ ব্যবহার এবং মেগাপ্রকল্প বর্জন করে মানবিক উন্নয়নে ব্যয় স্থানান্তরের মাধ্যমেও অর্থায়ন জোরদার করা হবে।
দেশে বিদ্যমান সরকারি কর্মসূচি:
বর্তমানে টিসিবি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ৪৫ লাখ পরিবারকে মাসে ৫ কেজি চাল, ২ লিটার সয়াবিন তেল ও ১ কেজি ডাল ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া হয়, যার বার্ষিক ব্যয় ৩,৫০০ কোটি টাকা।
এছাড়া ভিজিএফ কর্মসূচিতে দুই ঈদে ১০ কেজি চাল দেওয়া হয়। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ মানুষ বছরে ছয় মাস ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল পান, যার ব্যয় ২,৮৯৮ কোটি টাকা।
আর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভিডব্লিউবির সুবিধাভোগীদের ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। এতে ওই মন্ত্রণালয়ের খরচ হয় ১,৮৭২ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে এসব কাজে সরকারের ৯,৩৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ফলে এসব কর্মসূচি বাদ দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড চালু করলে, সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকা লাগবে।
উল্লেখ্য; বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতিহারে ৫০ লাখ পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার সেই অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবছে। এই সুবিধা দিতে সরকারের বছরে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদে এটি এক কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাওয়া উপকারভোগীদের নতুন ফ্যামিলি কার্ড কাঠামোর অধীনে আনা হতে পারে, ফলে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো একীভূত হতে পারে।




Comments