Image description

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিধান নয়, বরং এটি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ‘ব্যাপক ও দীর্ঘদিনের দাবির ফসল’। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।

গত ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারকের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় প্রদান করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষুণ্ণ করেনি। বরং এটি সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের ‘পবিত্রতা’ নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আদালত মনে করে, একটি নির্বাচিত সরকার থেকে অন্য নির্বাচিত সরকারে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রপাতির অপব্যবহার রোধে অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন ২০১১ সালের যে রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল, বর্তমান আপিল বিভাগ সেই রায়কে ‘একাধিক ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছে। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০১১ সালের সেই রায়টি ছিল ‘ব্যক্তিগতকৃত’ এবং কেবল ‘অনুমানমূলক আশঙ্কার’ ওপর ভিত্তি করে দেওয়া। ওই রায়ে সংক্ষিপ্ত আদেশ ও দীর্ঘ পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যে যে পদ্ধতিগত অসংগতি ছিল, তাও এবার সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে সর্বোচ্চ আদালত।

আদালত আরও বলেছে, ভবিষ্যতের কোনো প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার লালসায় প্রভাবিত হতে পারেন—এমন অমূলক আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিধান বাতিল করা বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

আদালতের এই রায়ের ফলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় হলেও এটি কেবল ‘ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার’ ভিত্তিতে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, বর্তমানে নির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষে অনুষ্ঠিতব্য ‘চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ থেকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকারের আমলে এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১১ সালে এটি বাতিল করা হয়। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ২০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট রিভিউ মঞ্জুর করে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন—বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। এই রায়ের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ‘আস্থার সংকট’ দূর হবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

মানবকণ্ঠ/আরআই