ভূপাতিত একটি যুদ্ধবিমানের এক ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী শুক্রবার রাতে ইরানে প্রবেশ করেছে।
ইরান তার আকাশসীমায় একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শত্রুপক্ষের গুলিতে ধ্বংস হওয়া প্রথম যুদ্ধবিমান ।
দ্যা টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুজন ক্রু সদস্য বিমান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, যার ফলে আটকে পড়া আমেরিকান বিমানসেনাদের খুঁজে বের করতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
দুটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার এবং নিচুতে উড়ন্ত জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের সমন্বয়ে পরিচালিত এক অভিযানে একজনকে উদ্ধার করা হয়, যেগুলোকে হালকা অস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি হেলিকপ্টারই ইরানের গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং একটি হেলিকপ্টার ইরাকি ভূখণ্ডে ফেরার সময় ধোঁয়ার রেখা ছড়াতে থাকে, তবে সেগুলো নিরাপদে অবতরণ করেছে।
শুক্রবার রাতে বাকি মার্কিন বিমানসেনার অবস্থান অজানা ছিল, এদিকে ইরানের গণমাধ্যম স্থানীয় মিলিশিয়াদের তল্লাশি অভিযান চালানোর ছবি সম্প্রচার করেছে।
মার্কিন বিমানটি ভূপাতিত করার ঘটনায় ইরান বিজয় দাবি করার পাশাপাশি, তাকে ধরার জন্য ৬০,০০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে বিভিন্ন সম্প্রচারে খবর দেওয়া হয়।
শুক্রবার গভীর রাতে হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন এ-১০ ওয়ারথগ, যা আকাশ থেকে সহায়তা প্রদানকারী একটি আক্রমণকারী বিমান, বিধ্বস্ত হওয়ার খবরও সামনে আসে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলিতে কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুলিতে নিজেদেরই তিনটি যুদ্ধবিমান হারায় যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম ইরান একটি মার্কিন সামরিক বিমান ভূপাতিত করল।
বিমানটির ক্ষতি এবং নিখোঁজ বিমানচালকের সন্ধান পেন্টাগনের জন্য একটি বড় ধাক্কা, যারা ইরানের ওপর আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে আসছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, এই ঘটনাটি যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন “যদি মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলটদের জিম্মি বা বন্দী হিসেবে আটক করার ছবি সম্প্রচার করা হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। কারণ, এই সংঘাতটি তখন আরও ব্যক্তিগতভাবে মানুষের ঘরে, তাদের বসার ঘরে, তাদের কম্পিউটার স্ক্রিনে চলে আসবে”।
তবে নিখোঁজ বিমানসেনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি কী করবেন, তা বলতে রাজি হননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন: “আসলে, আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না, কারণ আমরা আশা করি এমনটা ঘটবে না।”
ট্রাম্প ইরানকে বোমা মেরে “প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার” অঙ্গীকার করার পর, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখলে এই ঘটনাটি ঘটে ।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তরে বিমান হামলায় দেশটির অন্যতম বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত হয়েছে।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তীব্রতর করেছেন এবং সেতু ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মতো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বারবার হামলা চালিয়েছেন।
তেহরান এই হামলাগুলোকে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ” আখ্যা দিয়েছে এবং এর প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইসরায়েলে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। শুক্রবার ভোরে কুয়েতের একটি লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়, যা দেশটির বেসামরিক জনগণের জন্য পানীয় জল সরবরাহের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। যুক্তরাজ্যে জেট ফুয়েল সরবরাহকারী একটি তেল শোধনাগারেও হামলা চালানো হয়েছে।
এই হামলার জবাবে স্যার কিয়ার স্টারমারের দপ্তর জানিয়েছে যে, ব্রিটিশ ও কুয়েতি স্বার্থ রক্ষায় সহায়তার জন্য ব্রিটেন দেশটিতে তাদের র্যাপিড সেন্ট্রি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করবে।
সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে আয়োজিত শান্তি আলোচনা শুক্রবার ভেস্তে গেছে এবং জানা গেছে যে পাকিস্তানে আলোচকরা একটি “অচলবস্থায়” পৌঁছেছেন।
এর আগে জনাব ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানকে একটি ১৪-দফা পরিকল্পনা পাঠিয়েছিলেন, যেটিকে ইরানের শাসকগোষ্ঠী “অবাস্তব” বলে মনে করেছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইরানের দর কষাকষির অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করার ঘটনায় শান্তি আলোচনা প্রভাবিত হবে না বলে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে।
আলোচনা ব্যাহত হবে কিনা জানতে চাইলে জনাব ট্রাম্প বলেন: “না, মোটেও না। না, এটা যুদ্ধ। আমরা যুদ্ধে আছি।”




Comments