বর্তমান সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা শিক্ষা জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যখন লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করে, তখন একজন শিক্ষার্থীর ধৈর্যের পরীক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মানসিক দৃঢ়তার লড়াইয়ে পরিণত হয়। পরীক্ষার এই ক্রান্তিলগ্নে অন্ধকারের বাধা ডিঙিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত জীবনযাত্রা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই সংকটে প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হিসেবে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা একটি বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। লোডশেডিংয়ের সম্ভাব্য সময়সূচি আগে থেকে জেনে নিলে দিনের মূল্যবান সময়গুলো কোন কাজে ব্যয় হবে, তার একটি মানসিক ছক তৈরি করা সহজ হয়। অনিশ্চয়তাকে পরিকল্পনায় রূপান্তর করতে পারলে সময়ের অপচয় যেমন কমে, তেমনি মানসিক অস্থিরতা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।
একাকী অন্ধকারে পড়ার চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আলোকবর্তিকা জ্বালানো অনেক বেশি কার্যকর। সমমনা বন্ধুদের সাথে নিয়ে গ্রুপ স্টাডি বা দলগত পড়াশোনার অভ্যাস এই সময়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। কয়েকজন মিলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে পড়াশোনা করলে মোমবাতি বা চার্জার লাইটের সাশ্রয় হয় এবং কঠিন বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়। এটি কেবল শক্তির সাশ্রয় নয়, বরং একতা ও সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ। অভিজ্ঞ শিক্ষক বা বড় ভাই-বোনদের পরামর্শ গ্রহণ এই কঠিন সময়ে দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। সীমিত আলো বা প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ সময় পড়ার চেয়ে কোন অংশটুকু বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে হবে, তা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে জেনে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। তাদের সুচিন্তিত মতামত একজন শিক্ষার্থীর পাঠ্যক্রমকে আরও সংক্ষিপ্ত ও লক্ষ্যমুখী করতে সহায়তা করে।
বিপদের দিনে নিকটাত্মীয় বা বিশ্বস্ত প্রতিবেশীদের সহযোগিতা নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়। যদি কোনো আত্মীয়ের বাসায় আইপিএস বা জেনারেটরের সুবিধা থাকে, তবে পরীক্ষার এই বিশেষ সময়ে সেখানে গিয়ে পড়ার পরিবেশ খুঁজে নেয়া যেতে পারে। সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সহযোগিতা দেশাত্মবোধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সংকটের মুহূর্তে আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
অল্প সময়ে অধিক প্রস্তুতির কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘ সময় ধরে বইয়ের পাতা উল্টানোর চেয়ে মূল বিষয়বস্তু বা কী-ওয়ার্ডগুলো চিহ্নিত করে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ফ্লো-চার্ট, ডায়াগ্রাম বা সংক্ষিপ্ত নোটের মাধ্যমে পড়াশোনা করলে কম আলোতেও মস্তিষ্কে তথ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই কৌশলটি একদিকে যেমন শ্রম বাঁচায়, অন্যদিকে আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত রুটিন পরিবর্তন করা অপরিহার্য। ধরাবাঁধা নিয়মে না চলে যখন বিদ্যুৎ থাকে, তখন গণিত বা বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধান করে রাখা উচিত। অন্ধকারের সময়টুকুর জন্য মৌখিক পড়া বা রিভিশন দেয়ার কাজগুলো জমিয়ে রাখলে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। নমনীয় রুটিনই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি। ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমিয়ে অফলাইন পাঠ্যবই বা হাতে লেখা নোটের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। মোবাইল বা ল্যাপটপের চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার চিন্তায় নিমগ্ন না হয়ে হার্ডকপি পড়ার অভ্যাস করলে চোখের ওপর চাপ কম পড়ে। কাগজের বইয়ের ঘ্রাণ আর পাতার শব্দ শিক্ষার্থীর একাগ্রতাকে গভীর করে, যা কৃত্রিম পর্দার আলোয় অনেক সময় সম্ভব হয় না।
প্রাকৃতিক আলোর সদ্ব্যবহার করা এই সময়ে সবথেকে বড় কৌশল। দিনের আলো থাকতে থাকতেই সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ পড়াগুলো শেষ করে ফেলা উচিত। জানালার পাশে পড়ার টেবিল স্থাপন করে সূর্যের আলোকে কাজে লাগালে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে এবং পড়াশোনার মান উন্নত হয়। প্রকৃতি প্রদত্ত এই অমূল্য সম্পদই হতে পারে সংকটের দিনে শিক্ষার্থীর শ্রেষ্ঠ সারথি।
রাতের বেলা দীর্ঘ সময় জেগে পড়ার প্রবণতা পরিহার করা স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলকর। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে রাতে পড়ার চেষ্টা করলে চোখের ক্ষতি ও মাথাব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। তাই অন্ধকার রাতে নিজেকে ক্লান্ত না করে সেই সময়টুকু বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ রাখলে শরীর ও মন পরবর্তী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকে। অন্ধকারের স্তব্ধতাকে ভয়ের বদলে প্রশান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। ভোরে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা একজন সফল পরীক্ষার্থীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শেষ রাতের শান্ত পরিবেশ ও ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মনোযোগের মাত্রা থাকে সর্বোচ্চ। বিদ্যুৎ থাকুক বা না থাকুক, ভোরের আলোয় পড়ালেখা করলে তা স্মৃতিতে গেঁথে যায় দ্রুত। ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’ এই চিরন্তন সত্যটি লোডশেডিংয়ের মৌসুমে পরীক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
বিকল্প আলোর উৎস হিসেবে পর্যাপ্ত মোমবাতি বা হারিকেন মজুত রাখা একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। সামর্থ্য অনুযায়ী চার্জার ফ্যান বা লাইটের ব্যবস্থা থাকলেও আপৎকালীন সময়ের জন্য মোমবাতি হাতের কাছে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। আগুনের শিখার মৃদু আলোয় পড়ার সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। এই প্রস্তুতিটুকু শিক্ষার্থীর মনে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে।
তীব্র গরমে ও লোডশেডিংয়ের ধকল সামলাতে প্রচুর পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। পানিশূন্যতা মনোযোগ নষ্ট করে এবং শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে ফেলে। তাই পড়ার টেবিলের পাশেই সর্বদা বিশুদ্ধ পানির পাত্র রাখা উচিত। পর্যাপ্ত পানি পান করলে মস্তিষ্ক সচল থাকে এবং দীর্ঘক্ষণ পড়ার সক্ষমতা বজায় থাকে। শারীরিক সুস্থতাই জ্ঞান অর্জনের প্রধান ভিত্তি।
প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে ডাবের পানি পানের অভ্যাস করা যেতে পারে। ডাবের পানিতে থাকা ইলেকট্রোলাইট ও খনিজ উপাদান শরীরের ক্লান্তি দূর করে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। কৃত্রিম কোমল পানীয়র পরিবর্তে ডাবের পানির মতো দেশীয় ফল ও পানীয় গ্রহণ করা কেবল স্বাস্থ্যকরই নয়, এটি আমাদের দেশজ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসারও বহিঃপ্রকাশ। সুস্থ শরীরই পারে প্রতিকূলতাকে জয় করতে। সব বাধা সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে। বিদ্যুৎ নেই বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। জীবনের প্রতিটি সংকটই নতুন কিছু শেখায়; এই অন্ধকার সময়টিকে ধৈর্য ও সহনশীলতা অর্জনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। লক্ষ্য যদি অটল থাকে, তবে কোনো বাহ্যিক বিঘ্নই সাফল্যের পথ রোধ করতে পারে না। বিরতিহীন পরিশ্রম অনেক সময় মস্তিষ্ককে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে, তাই নিয়মিত বিশ্রাম নেয়া জরুরি। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে অল্প সময়ের বিরতি নিলে একঘেয়েমি দূর হয় এবং নতুন উদ্যমে পড়া শুরু করা যায়। বিশ্রামের সময়টুকুতে গান শোনা বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে, যা মনকে সতেজ রাখে। মনে রাখতে হবে, কেবল পরিশ্রম নয়, সঠিক বিশ্রামই সফলতার চাবিকাঠি।
অযথা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা প্রস্তুতির পথে বড় বাধা। ‘বিদ্যুৎ নেই, পরীক্ষা কেমন হবে’ এমন নেতিবাচক চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। উদ্বেগ কেবল মনোযোগ নষ্ট করে এবং আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। শান্ত মনে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিই সহজ মনে হয়। ইতিবাচক চিন্তা মনের জানালা খুলে দেয়। নিজের ওপর অগাধ আত্মবিশ্বাস রাখা একজন পরীক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রতিকূলতা আসবেই, কিন্তু তা জয় করার ক্ষমতা নিজের ভেতরেই সুপ্ত থাকে। ‘আমি পারব’ এই মানসিকতা অন্ধকার ঘরেও আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠে। আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থী জানে যে, পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই এবং সৃষ্টিকর্তা ধৈর্যশীলদের সহায় হন। এই বিশ্বাসই তাকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে রাখে।
স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার পরিহার করে ঘরে তৈরি তাজা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া উচিত। সুষম খাদ্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং পড়া মনে রাখতে সাহায্য করে। দেশীয় পুষ্টিকর খাবারের প্রতি গুরুত্ব দেয়া আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকারই নামান্তর। পরিশেষে বলা যায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কেবল একটি সাময়িক সমস্যা, যা দমে যাওয়ার কোনো কারণ হতে পারে না। দেশপ্রেমিক ও সাহসী প্রজন্ম হিসেবে শিক্ষার্থীদের উচিত অন্ধকারের সাথে লড়াই করে জ্ঞানের আলোয় নিজেকে আলোকিত করা। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, সময়ানুবর্তিতা আর অদম্য সাহসিকতাই পারে সব বাধা টপকে কাক্সিক্ষত সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে। আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে এই কঠিন সময়টুকু তোমাদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকুক।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক




Comments