যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে উত্তরাঞ্চলের বন্ধ থাকা স্থানীয় বিমানবন্দরগুলো পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উত্তরাঞ্চলের অব্যবহƒত অ্যাভিয়েশন অবকাঠামো পুনরুজ্জীবিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বগুড়া বিমানবন্দর। এরপরই রয়েছে ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট বিমানবন্দর।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্পতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বন্ধ বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে উত্তরবঙ্গে শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষি-পণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন, যাতে কৃষি উৎপাদনে সমৃদ্ধ উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো যায়।
অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি এই অঞ্চলের অনন্য রপ্তানি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলে উদ্বৃত্ত শস্য, বিশেষ করে ফল ও দুধ উৎপাদিত হয়। সেখানে উৎপাদিত টিউলিপ রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। ইউরোপে যখন নির্দিষ্ট মৌসুমে টিউলিপ উৎপাদন বন্ধ থাকে, তখন উত্তরবঙ্গে তা পূর্ণ প্রস্ফুটিত অবস্থায় থাকে, যা ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানির একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) রংপুর ও সিরাজগঞ্জে নতুন ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সেতুর নিকটবর্তী এলাকা এবং কুড়িগ্রামসহ এই অঞ্চলজুড়ে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল এরই মধ্যে অনুমোদিত বা উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, উন্নত বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় আকারের শিল্প উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে। দেশের ১২টি বিমানবন্দরের মধ্যে ছয়টি বছরের পর বছর ধরে অচল হয়ে আছে। এর মধ্যে চারটি উত্তরাঞ্চলে এবং বাকি দুটি কুমিল্লা ও মৌলভীবাজারের শমসেরনগরে অবস্থিত। এগুলোর বেশিরভাগই ব্রিটিশ আমলে বিমানঘাঁটি হিসেবে নির্মিত এবং কিছু পাকিস্তান আমলেও চালু ছিল।
এগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়ে বেবিচক এরই মধ্যেই একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে। বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর নূর-এ-আলম জানান, উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিস্তারিত ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং সুনির্দিষ্ট ব্যয়ের হিসাবও এখনো করা হয়নি।
বেবিচক অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা, বাজারের চাহিদা, জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রকল্প ব্যয় বিশ্লেষণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র ডাকার পরিকল্পনা করেছে। বেবিচকের এই কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলো বগুড়া বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করেই নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যেকোনো অঞ্চলে বিমানবন্দরের উন্নয়ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উদ্দীপিত করে এবং উত্তরাঞ্চলও এর ব্যতিক্রম হবে না।’
বর্তমানে কক্সবাজার, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুর, সিলেট এবং বরিশাল অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলো সচল রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং এয়ার অ্যাস্ট্রার মতো বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো ঢাকা থেকে এসব রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। উত্তরাঞ্চলজুড়ে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য শিল্প উন্নয়ন চলছে। সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতুর কাছে একটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কুড়িগ্রামে ভুটানের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।
রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, দিনাজপুর এবং গাইবান্ধায় আরও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, বগুড়া থেকে শুরু করে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালু করা হলে উত্তরাঞ্চলের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। এই অঞ্চলে এরই মধ্যে দুটি ইপিজেড রয়েছে এবং আরও কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিকল্পিত রয়েছে। রংপুর চিনিকলের ৪৫০ একর জমিতে একটি ইপিজেড নির্মিত হবে, যা এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরদী ইপিজেড ২০১২ সালে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়, যখন ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও’ দেশের প্রথম লিড প্ল্যাটিনাম-প্রত্যয়িত গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে এই অঞ্চল থেকে ২.২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয় এবং এখানে ২১ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘রংপুর ও সিরাজগঞ্জে ইপিজেড স্থাপনের কাজ পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভৌগোলিক পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।’ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আন্তর্জাতিক মানে নির্মিত এবং ২০০০ সালে কাজ শেষ হওয়া সত্ত্বেও বগুড়া বিমানবন্দরটি অব্যবহৃত পড়ে আছে।
সরকারের নতুন উদ্যোগে এটি সচল করতে আরও ৫৫০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। গত বছর বিমান বাহিনী প্রধান এবং বেবিচক চেয়ারম্যানসহ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এটি পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্টরা ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের নিকটবর্তী অবস্থান এবং এসেনশিয়াল ড্রাগস ও উত্তরা মোটরসের মতো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির কারণে বগুড়ার কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম এসব রুটের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়ে আসছি। ঢাকা-বগুড়া এবং ঢাকা-ঠাকুরগাঁওয়ের মতো রুটগুলোতে ১৭-১৮ আসনের ছোট বিমান চালানো যেতে পারে; এমনকি ১০-১১ জন যাত্রী নিয়েও এসব ফ্লাইট লাভজনক করা সম্ভব।’ তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সফল ঈশ্বরদী ইপিজেডের গুরুত্ব বিবেচনায়-ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি-ও দ্রুত চালু করার ওপর জোর দেন।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে ১৯৬২ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলত। ১৭ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এটি চালু হলেও ২০১৪ সালে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এয়ারলাইন্সগুলো রানওয়ের স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং দুর্বল এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টকে এই বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে দায়ী করে। বিএনপির ইশতেহারে উত্তরাঞ্চলে কর্মসংস্থান ও সুষম উন্নয়নের জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই অঞ্চলটি দেশের চাল, ভুট্টা, গম, আলু এবং পেঁয়াজের বিশাল অংশের যোগান দেয়। আম, লিচু, ফুল ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনেও এই অঞ্চলটি শীর্ষস্থানীয়। রাশেদ তিতুমীর জানান, উত্তরের জেলাগুলোতে বিনিয়োগে আগ্রহী ১০টি বড় শিল্প গ্রুপকে সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। বিডা-র নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য বাড়াতে উত্তরাঞ্চলকে প্রতিবেশী দেশ বিশেষ করে ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের মাধ্যমে এই অঞ্চলের অচল রাষ্ট্রীয় শিল্প ইউনিটগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে। বিডা জেলাভিত্তিক শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তোলা এবং অটোমোবাইল প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনার বিষয়ে আলোচনার পরিকল্পনা করছে। বিডা প্রধানের মতে, বগুড়ার মতো জেলাগুলোতে হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং রংপুরে কৃষি-পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। বগুড়া বর্তমানে ফাউন্ড্রি শিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং স্যানিটারি পণ্য তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তবে লজিস্টিক সমস্যা এবং অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বগুড়া বিমানবন্দরটি চালু হলে পার্শ্ববর্তী নওগাঁ, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ জেলাও উপকৃত হবে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন। বগুড়ার ইয়ামাহা ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া চেম্বারের সদস্য আবু মোত্তালেব মানিক বলেন, ‘বর্তমানে বগুড়া থেকে ঢাকা যেতে সড়কপথে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। বিমানবন্দর চালু হলে এই সময় মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টায় নেমে আসবে।’ তিনি আরও জানান, বিমানবন্দর না থাকায় অনেক বিদেশি ও করপোরেট পর্যটক বগুড়ায় আসতে চান না।
এটি চালু হলে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঈশ্বরদী ইপিজেড এবং এই অঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনা বিবেচনায় ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালু করাও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তিনি। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, প্রতিদিন উত্তরাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ সবজি ঢাকায় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু যানজটের কারণে সময়মতো পণ্য বাজারে না পৌঁছানোয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পোল্ট্রি খাতের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
মফিদুর রহমানের মতে, কেবল অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়-সেটির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; অন্যথায় এটি আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে। সরকার, বিমান পরিচালনাকারী সংস্থা এবং যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বগুড়া বিমানবন্দর প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, সেখানে যেহেতু বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ইউনিট রয়েছে, তাই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এটিকে বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্যও ব্যবহার করা সম্ভব।




Comments