Image description

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ যেন এক জীর্ণ নৌকা; ওপরে রঙচঙে প্রতিশ্রুতির পাল, কিন্তু নিচে ফুটো গর্ত দিয়ে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে পানির স্রোত। এই নৌকাটি ভাসছে ঠিকই, কিন্তু কতক্ষণ? এই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবের কঠিন উদ্বেগ। নির্বাচিত সরকার হোক বা অন্তর্বর্তী; রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যখন কারও হাতে থাকে, তখন সেই দায়িত্বের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত মানুষের জীবন রক্ষা। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে, এই মৌলিক শর্তই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে।

বাংলাদেশ একসময় জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার একটি সফল মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল। টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বহু সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল; পোলিও নির্মূল, টিটেনাস নিয়ন্ত্রণ- এসব অর্জন কেবল কাগুজে পরিসংখ্যান ছিল না, ছিল বাস্তব সাফল্যের গল্প। কিন্তু সেই গল্প আজ যেন উল্টো পথে হাঁটছে। স¤প্রতি দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব তার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে কয়েক হাজার সংক্রমণ এবং শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে; অধিকাংশ আক্রান্তই টিকাবঞ্চিত শিশু। এটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, ব্যর্থতা এবং নীতিগত ভুলের জমাট ফল। হাম এমন একটি রোগ, যাকে একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল একেবারে নির্মূল করা। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়েছে; ভ্যাকসিন ঘাটতি, সরবরাহে ব্যাঘাত এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আবারও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে, সামান্য বিঘ্নই বড় ধরনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করতে পারে, যার ফলেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । বাংলাদেশে এখন ঠিক সেটিই ঘটছে।

একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেকটা মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মতো। বাইরে থেকে আঘাত এলে যদি ভিতরের প্রতিরোধ শক্তি দৃঢ় থাকে, তবে বিপদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু যখন সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সামান্য সংক্রমণও মহামারির রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় বা সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না। তবে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক অদক্ষতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে বিঘ্ন, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন এসব মিলেই টিকাদান কাভারেজে বড় ধরনের পতন ঘটিয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার শিশু সুরক্ষার বাইরে চলে গেছে ।

এখানেই প্রশ্ন উঠে, রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে? কারণ স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা বিদ্যমান। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই অপর্যাপ্ত, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং সরঞ্জাম নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি যেন একটি বিশাল অট্টালিকা নির্মাণের পরিকল্পনা, কিন্তু ভিত্তির জন্য পর্যাপ্ত কংক্রিট নেই। 

আরও উদ্বেগজনক হলো সংক্রামক রোগের বহুমাত্রিক বিস্তার। হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, জলাতঙ্ক, ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে পার্বত্য ও দুর্গম এলাকায় ম্যালেরিয়া এখনও একটি বাস্তব হুমকি; বৈশ্বিক পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, এই রোগ এখনও লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা একদিকে পুরোনো রোগের পুনরুত্থান দেখছি, অন্যদিকে নতুন ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করছিÑ একটি দ্বিমুখী সংকটে আটকে পড়েছি। 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো কেন্দ্রীয়করণ। উন্নত চিকিৎসা সুবিধা শহরে কেন্দ্রীভূত; গ্রামীণ জনগণ প্রাথমিক সেবা থেকেও বঞ্চিত। ফলে ছোট রোগ বড় হয়ে ওঠে, আর বড় রোগ হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ। এই পরিস্থিতি অনেকটা এমন, যেন একটি শহরে সব ফায়ার সার্ভিস রাখা হয়েছে, কিন্তু গ্রামের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়লে পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাও এখানে বড় ভ‚মিকা রাখছে। নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব, হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, এবং সমন্বয়ের ঘাটতি- এসব কারণে স্বাস্থ্য খাত একটি স্থিতিশীল দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। কোনো কার্যকর কাঠামো বাতিল করার আগে তার বিকল্প তৈরি না করা যেমন একটি বড় ভুল, তেমনি বাস্তবায়নের পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির অভাব পুরো ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।

চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ ও মনোবল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ঘন ঘন বদলি, প্রশাসনিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা তাদের পেশাগত সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একজন চিকিৎসক যদি নিজেই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তবে রোগীর প্রতি তার সেবার মান কতটা নিশ্চিত হবে- এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ওষুধশিল্প, যা বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী খাত হিসেবে বিবেচিত, সেখানেও নীতিগত অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। সমন্বয়হীন সিদ্ধান্ত, হঠাৎ বিধিনিষেধ; এসব উদ্যোগ স্বচ্ছতার নামে নতুন জটিলতা তৈরি করছে। একটি খাতকে শক্তিশালী করতে হলে তার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন; একতরফা সিদ্ধান্ত সেখানে উল্টো ফল দিতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এখন এক ধরনের ‘সাইলেন্ট ক্রাইসিস’-এর মধ্যে রয়েছে। এটি এমন একটি সংকট, যা প্রতিদিন দৃশ্যমান নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে সমাজের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি শিশুমৃত্যু, প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংক্রমণ- এসবই সেই সংকটের নীরব সাক্ষী। এই অবস্থায় সবচেয়ে প্রয়োজন শক্তিশালী জবাবদিহি। কে ব্যর্থ হলো, কেন ব্যর্থ হলো, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। দায় নির্ধারণ না করলে একই ভুল বারবার পুনরাবৃত্তি হবে। শুধু তদন্ত নয়, কার্যকর শাস্তি এবং ভবিষ্যতের জন্য কাঠামোগত সংস্কার- এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এখনই। বাজেট বাড়ানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ; এসব কেবল সুপারিশ নয়, এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ; একটি অবহেলার, অন্যটি সংস্কারের। অবহেলার পথ ধরে এগোলে এই সংকট আরও গভীর হবে; আর সংস্কারের পথ বেছে নিলে এখনও পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকদের জীবনের প্রতি দায়বদ্ধ হয়, তবে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- এই নৌকাটি মেরামত করা হবে, নাকি ডুবে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হবে।

লেখক: ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর