আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটাসহ নানা কারণে বজ্রপাত বেড়ে গেছে। এতে বাড়ছে প্রাণহানিও। প্রতি বছর অন্তত ৩ শতাধিক প্রান্তিক মানুষ বজ্রপাতে মারা যাচ্ছেন। সাধারণত বর্ষাকালে বজ্রপাত হতো না আগে। এখন আর সেই হিসাব মিলছে না। বর্ষাতেও অনেক প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই ঘাতক। এই বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আগের হিসাব ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চৈত্র-বৈশাখের তান্ডবে অন্তত অর্ধশত লোকের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। সবশেষ গতকাল সোমবার নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর আগের দিন রবিবার একদিনেই অন্তত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গাইবান্ধায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুজন, জামালপুরে দুজন, ঠাকুরগাঁওয়ে দুজন, বগুড়ায় একজন, নাটোরে একজন ও পঞ্চগড়ে একজন মারা গেছেন। এসব ঘটনায় অনেকে আহত হয়েছেন। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল (৫ বৈশাখ) একদিনে বজ্রপাতে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু হয়। বৈশাখের আগেও বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছিল কমপক্ষে ৩০ জনের। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষক।
সাধারণ মানুষের মনে এখন আকাশে মেঘ জমলেই মনের অজান্তে এক শঙ্কা কাজ করে, ‘বজ্রপাত হবে না তো?’ কার্যত বাংলাদেশে এখন বজ্রপাত নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে, যা প্রতি বছর কেড়ে নিচ্ছে শতশত মানুষের প্রাণ। একসময় এটিকে মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রকোপ ও প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বজ্রপাতে এখন সারাবছরই ঘটছে প্রাণহানি। কিন্তু, বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল রোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প প্রণয়ন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলোও খুব একটা কাজে আসেনি। যদিও বজ্রপাতে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের মে মাসে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে সচেতনতা। সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি প্রকল্প নেয়ার কাজও চলছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন করে একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণ করা হবে। আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। প্রকল্প প্রণয়নের জন্য উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে প্রকল্প চূড়ান্ত করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সাধারণত মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিকে বজ্রপাতের মৌসুম শুরু হয়। জুন ও জুলাই পর্যন্ত তা থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেখা গেছে, এখন বজ্রপাতের কোনো হিসাব মিলছে না। বর্ষাকালেও এখন বজ্রপাত হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা বজ্রপাতের বিষয়ে মানুষের সচেতন করার কাজটি করছি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। আমাদের এক পৃষ্ঠার একটি সতর্কবার্তা আছে, সেটা আমরা সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি যেন মানুষ সচেতন হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছি।
অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় টিআর কর্মসূচির আওতায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এ টাকা দিয়ে ওই এলাকায় ৩৪৩টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর একটি প্রকল্প প্রণয়নে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণ করা হবে। এ শেডে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। এ শেড কৃষকরা ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের জন্য ধান মজুতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা হবে।
মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন আরও বলেন, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার জেলার সব উপজেলা থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে আমরা প্রকল্প নেবো। মাঠ ও হাওরের কৃষকরা যেখানে কাজ করেন, আশপাশে কোথাও আশ্রয় নেয়ার জায়গা নেই, সেখানে এ মাল্টিপারপাস শেডগুলো নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক বিঘা জমির ?ওপর এটা হবে।
বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমাতে কাজ করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’।
ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, বজ্রপাতে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৯৮ জন মৃত্যুবরণ করেছে। এদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর গড়ে ৩০০-৩৫০ জন লোকের প্রাণহানি ঘটে। তিনি বলেন, বজ্রপাত থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে সচেতনতা। আমাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত লোকজনও বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় জানেন না। আকাশে কালো মেঘ দেখা গেলে এবং বৃষ্টি হলে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নিষেধ। অথচ কৃষকসহ বহু মানুষ তা উপেক্ষা করে কাজ করেন। এমনকি শিক্ষিত মানুষও বৃষ্টি হলে গাছের নিচে অবস্থান করেন। অথচ গাছের নিচে অবস্থান করা মানে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া।
রাশিম মোল্লা বলেন, বজ্রপাত থেকে মানুষের মৃত্যু কমাতে আমরা পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা, বজ্রপাতের অন্তত ৩০ মিনিট আগে পূর্বাভাস জানা যায়- এ তথ্য দ্রুত হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশের মানুষকে টেলিফোনের মাধ্যমে জানানোর উদ্যোগ নেয়া, সচেতনতা বাড়াতে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পর্যাপ্ত সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা, মাঠে মাঠে শেল্টার সেন্টার স্থাপন এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেয়া হলেও সেগুলো অনুমোদন পায়নি। মাঠে কাজ করতে দিয়ে যেখানে কৃষকরা মারা যান, সেখানে আসলে তেমন কোনো স্থাপনা নেই। তিনি বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কোনো প্রকল্প মন্ত্রণালয় পর্যায়ে উপস্থাপন করলে হয়তো তখন তা পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য বিবেচনা করা হবে।
এক যুগে ৩৪২৫ জনের মৃত্যু: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে গত ১২ বছরে দেশে ৩ হাজার ৪২৫ জন মারা গেছেন। তবে বলা হয়, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩০৭ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ১৫৮ জন, ২০২০ সালে ২৫৫ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩৫০ জন, ২০২৪ সালে ২৪৩ ও ২০২৫ সালে ২৬৬ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন।
ব্যর্থ যত সব উদ্যোগ: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর) টাকা দিয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটেনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়েছে। বলতে গেলে এ পদক্ষেপ কাজে আসেনি। এতে অনিয়ম-দুর্নীতি তো ছিলই। বজ্রপাত ঠেকাতে তালগাছ রোপণের কর্মসূচিও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাতিল করা হয়। এছাড়া বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কয়েক দফা প্রকল্প নেয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। টিআর নীতিমালা সংশোধন করে বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি রোধে ১৫টি জেলায় ‘বজ্র নিরোধক দণ্ড, বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার)’ স্থাপনে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। টাকা খরচ দেখানো হলেও অনেক জায়গায় বসেনি কোনো বজ্র নিরোধক দণ্ড ও বজ্রনিরোধক যন্ত্র। এ নিয়ে বহু চিঠি চালাচালি ও তদন্তও করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জেলায় ৩৪৩টি বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্র নিরোধক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।




Comments