Image description

বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় থেকে বর্তমান সরকারের সময় পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির অন্যতম একটি স্তম্ভ, যার ওপর ভর করেই দেশের অর্থনীতি চলমান থাকে। অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, সরকারি ঘাটতি বাজেট পূরণ এবং জনগণের আমানত সংগ্রহে ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

বিগত প্রায় এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের বড়ই অভাব দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ পাচার হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রকাশিত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, প্রায় ২৩ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংক রেজুলেশন ২০২৫ অনুযায়ী অর্থ আত্মসাৎকারীদের মালিকানা রহিত করেছিল।

কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৬ সংশোধন করে তা পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা করেছে। অনেকের মতে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের যে সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা পুনরায় স্বপ্নভঙ্গ হলো এবং নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি করা হলো।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫’-এ ব্যাংক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফেরার সুযোগ না থাকার যে বিধান ছিল, তা সংশোধন করে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬’ এ ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে বলা হয়, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ারধারক অথবা শেয়ারধারকরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনরায় ধারণ বা ধারণ করার জন্য রেজুলেশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে পারবেন। 

তবে শেয়ার পুনরায় ধারণের আবেদন করার ক্ষেত্রে পৃথক অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। যেসব অঙ্গীকার করতে হবে, তার মধ্যে আছে- রেজুলেশনভুক্ত হওয়ার আগে বা পরে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সব অর্থ পরিশোধ করে ব্যাংক পরিচালনায় ইচ্ছা প্রকাশ। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত অর্থের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ জমা দেবেন এবং বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরে মাত্র ১০ শতাংশ সুদসহ পরিশোধ করবেন।

বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিলটির নিয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সাইফুল ইসলাম মিলন (ঢাকা-১২) জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমানতকারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। বিলটির মাধ্যমে কোটি মানুষের আমানতের সুরক্ষাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। অতীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সাধারণ করদাতার টাকা থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক বাঁচানো হয়েছে। 

এই অধ্যাদেশটি বাতিল হলে লুণ্ঠনকারীরা আইনি ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তিনি আরও বলেন, আগে নিয়ম ছিল ব্যাংক ডুবলে শেয়ারহোল্ডাররা আগে ক্ষতি বহন করবে, আমানতকারীরা থাকবেন সুরক্ষিত। কিন্তু নতুন আইনি কাঠামোয় সেই চেইন অব কমান্ড ব্যাহত হতে পারে। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামি মালিকানার মাধ্যমে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা মোকাবিলায় আগের কঠোর আইনি কাঠামো বজায় রাখা জরুরি ছিল’। 

বিরোধিতার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং গুড গভর্ন্যান্স, এই তিনটিই বিএনপির মূল নীতি। আমরা আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বাস্তবতা বুঝতে হবে। এরইমধ্যে সরকার ব্যাংক খাতে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণ সময়ে কোনও সরকারের পক্ষে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ বহন করা সম্ভব নয়।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ বিলের মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি অল্টারনেটিভ অপশন। 

এর ফলে শুধুমাত্র লিকুইডেশনের ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে মূলধন পুনর্গঠনের সুযোগ থাকবে। এতে আমানতকারীদের আস্থা বাড়বে এবং ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডাররা সুরক্ষা পাবেন।’

বিলটি নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘সরকার যে যুক্তিই দেখাক না কেন, দুর্নীতি ও লুটপাট সহায়ক ও সুরক্ষাকারী এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা দূরে থাক, বিশালভাবে পুরষ্কৃত করা হলো, যা আত্মঘাতীমূলক। সরকারের এ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হলেও অবাক করার মতো তেমন কিছু নেই। কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ যে ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়, বরং ‘উইনার টেইকস অল’ ফর্মুলায় নীতিদখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম রাখা, সরকারের এ পদক্ষেপ তারই দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা মাত্র।’’

ব্যাংক কোম্পানি রেজুলেশন নিয়ে সরকার এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে ফেলেছে সাধারণ জনগণকে। যত যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, ব্যাংকিং খাতে সাধারণ আমানতকারীদের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা আরও জোরালো হবে। সরকার পারবে কি তার অবস্থান আরও পরিষ্কার করতে? সরকার যে যুক্তিগুলো দিয়েছে, তাতে কয়েকটি প্রশ্ন থেকেই যায়। যেমন, যারা ব্যাংক লুট করেছে এবং দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে, তারা কি না সাড়ে সাত শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে আবার ব্যাংকের মালিকানায় আসবে! যদিও কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এই শর্তগুলো ব্যাংক লুটকারীরা খুব সহজেই পাশ কাটিয়ে মালিকানা ফিরে পেতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, আমি যদি একশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে পারি, সেখান থেকে সাড়ে সাত কোটি টাকা জমা দিয়ে নিয়মিত (রেগুলার) হতে পারলাম, তাহলে লাভবান হলাম সাড়ে ৯২ কোটি টাকা। আবার আপাতদৃষ্টিতে অংশগ্রহণও করতে পারলাম। 

পরবর্তী দুই বছরে দশ শতাংশ অর্থ জমা দেয়ার কথা, অর্থাৎ ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা বা সুদসহ আরও কিছু বেশি দিতে হবে। কিন্তু আমি তো আরও দুই বছর সময় পেলাম। এই দুই বছরে নিয়ম-কানুন আরও পরিবর্তন করা যাবে, অর্থাৎ বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিকভাবে আমানতকারীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে। সরকারের দেয়া আশি হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ থেকেও আরও বেশ কিছু অর্থ খুব সহজে আত্মসাৎ করা যেতে পারে, যেমনটা ইতিপূর্বে ঘটানো হয়েছে। 

অতীতে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ ব্যাংক লুটকারীদের এমনভাবেই সহযোগিতা করেছে। বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়। নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আমানতকারীদের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারকে বুঝতে হবে, অর্থনীতির জন্য ব্যাংক একটি স্পর্শকাতর বিষয়। তাই এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ছেলেখেলা করা সমীচীন নয়। যে এস আলমকে ঘিরে এত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেই এস আলমকে সুযোগ দিয়ে সরকার কী ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে, সে প্রশ্নই জনমনে উঁকি দিচ্ছে। 

ব্যাংক রেজুলেশন পরিবর্তন করে ইসলামী ব্যাংককে বিরোধী দলের প্রভাব থেকে দূরে রাখাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এস আলমকে দিয়ে সরকারের কতটুকু উপকার হবে? বিরোধী দল আপনার সমালোচনা করে আপনাকে সঠিক পথ দেখাতে পারে বা সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু ব্যাংক লুটকারীরা আপনাকে কতটুকু সহযোগিতা করবে? যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছে এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব অর্জন করেছে। ব্যাংক রেজুলেশন বিষয়টির সঙ্গে দেশের অর্থনীতি জড়িত, যেখানে অর্থনীতি ইতোমধ্যেই নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। 


এই নড়বড়ে অর্থনীতি নিয়ে এমন ঝুঁকি নেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। এ বিষয়টি প্রমাণিত যে, বিগত সময়ে তারল্য সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর মালিকদের অনেকেই চিহ্নিত লুটপাটকারী। সুতরাং, তাদেরকে কোনোভাবেই ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়া উচিত নয়। যদি বর্তমান সরকার তা করে, তাহলে তা হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসবে, এমন প্রত্যাশা দেশের সাধারণ নাগরিক ও আমানতকারীদের। বর্তমান সরকার সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে, এমন প্রত্যাশাও সবার। আর যদি সরকার আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে বিশ্বাসের বড় ঘাটতি দেখা দেবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য কখনোই কাম্য নয়।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট