Image description

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে, প্রবৃদ্ধি কমছে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন রাজস্ব নীতি গ্রহণ করা যায়, যা অর্থনীতিকে চাপে না ফেলে বরং শক্তিশালী করে। তামাকজাত দ্রব্যের ওপর কর বৃদ্ধি সেই ধরনের একটি কার্যকর ও প্রমাণভিত্তিক সমাধান হিসেবে সামনে আসে। 

আমাদের দেশে তামাক খাতকে অনেক সময় রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর আড়ালে থাকা প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র ভিন্ন। তামাক ব্যবহারজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা এই খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে তামাক কোনোভাবেই লাভজনক খাত নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা।

একজন নিন্ম আয়ের শ্রমিকের কথাই ধরা যাক। তিনি প্রতিদিন অল্প অল্প করে তামাকে ব্যয় করেন, যা মাস শেষে একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পৌঁছায়। কয়েক বছর পর যদি তিনি তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তার পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, আয় কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবারই দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হয়। 

এই ক্ষতির একটি বড় অংশ পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিকেও আঘাত করে।

অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো, কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার ব্যবহার কমে। তামাকের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, বিশেষ করে তরুণ ও নিন্ম আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে যখন নিন্ম মূল্যের সিগারেটের দাম কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, তখন দেখা গেছে অনেকেই ধূমপান কমিয়ে দিয়েছেন বা নতুন করে শুরু করা থেকে বিরত থেকেছেন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। চযরষরঢ়ঢ়রহবং-এ ২০১২  সালে তামাক কর সংস্কারের পর ধূমপানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এবং একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত রাজস্ব স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। তামাক কর বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার যেখানে বিভিন্ন খাতে কর বাড়াতে গিয়ে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে তামাক একটি ব্যতিক্রম। কারণ, তামাকের দাম বাড়লেও একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোক্তা বাজারে থাকে, ফলে কর বৃদ্ধির পরও রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। সঠিক নীতি গ্রহণ করা হলে এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য খাতের ওপর তামাকের চাপ কমানো গেলে তার ইতিবাচক প্রভাবও ব্যাপক। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে তামাকজনিত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যদি তামাক ব্যবহার কমে, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমবে, চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সেই সাশ্রয় করা অর্থ অন্য উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যাবে। একই সঙ্গে সুস্থ জনগোষ্ঠী অর্থনীতিতে বেশি উৎপাদনশীল ভ‚মিকা রাখতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। তরুণ প্রজন্মকে তামাকের ক্ষতি থেকে রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি। 

আমাদের দেশে তামাকপণ্য এখনও তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সহজলভ্য। ফলে অনেক তরুণ খুব সহজেই ধূমপানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তামাকের দাম বাড়ানো হলে নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে যায়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করে এবং দেশের মানবসম্পদকে আরও শক্তিশালী করে।

তামাক ব্যবহার দারিদ্র্যের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নিন্ম আয়ের পরিবারগুলো তাদের সীমিত আয়ের একটি অংশ তামাকে ব্যয় করে, যা খাদ্য, শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করা যেত। তামাকের দাম বাড়লে এই ব্যয় কমে আসে এবং পরিবারগুলো তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারে। ফলে এটি দারিদ্র্য হ্রাসেও ভূমিকা রাখে। তামাক কর বৃদ্ধির বিষয়ে কিছু আপত্তিও প্রায়ই শোনা যায়। অনেকে বলেন, এতে খুচরা বিক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রেতা শুধু তামাক নয়, অন্যান্য পণ্যও বিক্রি করেন এবং সহজেই বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজে নিতে পারেন। 

আবার চোরাচালান বাড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়, কিন্তু বাংলাদেশে তামাকপণ্যের দাম এখনও অনেক দেশের তুলনায় কম হওয়ায় এই আশঙ্কা বাস্তবসম্মত নয়। তবে কেবল কর বাড়ানোর সাথে সাথে, কর কাঠামোও সংস্কার করতে হবে। 

বর্তমানে তামাকপণ্যে বহুস্তর কর ব্যবস্থা বিদ্যমান, যার ফলে সবসময়ই একটি সস্তা বিকল্প বাজারে থেকে যায়। এই কাঠামো সরল করে কার্যকর কর ব্যবস্থা চালু করা গেলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আরও সফল হবে এবং রাজস্ব আহরণও বাড়বে। বর্তমান বাজেট বাস্তবতায় তামাক কর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যখন সরকার বড় আকারের বাজেট প্রণয়নের কথা ভাবছে এবং একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি, তখন তামাক খাত থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি কমবে, ঋণনির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে।

সবকিছু বিবেচনায় তামাক কর বৃদ্ধি কেবল একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে যেমন লাখো মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, তেমনি দেশের অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করা যায়। এখন প্রয়োজন সাহসী, প্রমাণভিত্তিক এবং জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা বাংলাদেশকে একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ