Image description

কলকাতার সেই চিরচেনা উৎসবের আমেজ আজ বিলীন। শতাব্দীর ঐতিহ্য ভেঙে কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডে এবার ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতে দেয়নি শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। ফলে দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে ঈদের প্রধান জামাত সরিয়ে নেওয়া হয় ব্রিগেড ময়দানে। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল সাড়ে ৮টায় সেখানে নামাজ অনুষ্ঠিত হলেও ছিল না কোনো প্রাণের স্পন্দন। লাখো মানুষের ভিড়ের পরিবর্তে হাজির হয়েছিলেন মাত্র কয়েক হাজার মুসল্লি। রাজ্যজুড়ে কোরবানি প্রায় বন্ধ থাকায় পুরো পশ্চিমবঙ্গ আজ এক অব্যক্ত বিষাদের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে।

উৎসবের দিনেও কলকাতার আকাশ আজ গুমোট। দেড়-দুই লাখ মানুষের মিলনমেলা যেখানে হওয়ার কথা, সেখানে ব্রিগেডের ধূসর মাঠে গুটি কয়েক মানুষের উপস্থিতি যেন এক বঞ্চনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামাজে ইমামতি করেন ক্বারী ফজলুর রহমান। তবে মুসল্লিদের চোখে-মুখে ছিল না কোনো ঈদের আনন্দ, বরং এক গভীর দীর্ঘশ্বাস যেন সবার হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল।

রেড রোডে ঈদের জামাতের এক সুদীর্ঘ ও গর্বিত ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে খিলাফত কমিটির হাত ধরে এই নামাজের সূচনা। দেশভাগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা—কোনো কিছুই এই ঐতিহাসিক ধারাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। এমনকি ব্রিটিশ সরকারও কখনো রেড রোডে নামাজে বাধা দেয়নি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করা হলো।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খাঁ ফোর্ট উইলিয়াম, ব্রিগেড মাঠ, ময়দানসহ প্রায় ২৫৫৫ বিঘা জমি ওয়াকফ করেছিলেন। অথচ আজ সেই ওয়াকফ সম্পত্তির বড় একটি অংশ বেদখল হয়ে আছে। সাচার কমিটির রিপোর্টের ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও মুসলিমদের শিক্ষা বা সামাজিক উন্নয়নে এই জমি ব্যবহারের সুপারিশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি রাজভবন থেকে এই জমির ভাড়া হিসেবে একসময় মাত্র ১৯৯ টাকা দেওয়ার যে ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে, তা আজ শুধুই করুণ স্মৃতি।

এই বিষাদ কেবল একটি জামাত বন্ধ হওয়ার নয়, বরং কয়েক শতাব্দীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ম্লান হওয়ার। যে কলকাতায় সম্রাট জাহাঙ্গীর কালীঘাট মন্দিরের জন্য জায়গা দিয়েছিলেন কিংবা মুসলিমরা শিবমন্দিরের জন্য জমি উৎসর্গ করেছিলেন, আজ সেই সম্প্রীতির সুর বড় বেশি বেসুরো ঠেকছে। উৎসবহীন এই ঈদুল আজহা যেন এক ঐতিহাসিক বঞ্চনার নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।

মানবকণ্ঠ/আরআই