পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক চরম নাটকীয়তার অবসান ঘটল। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে যে তৃণমূল কংগ্রেসের যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ ২৮ বছর পর তা এক নজিরবিহীন ভাঙনের মুখে পড়ল। মাত্র ১৩ দিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনে তৃণমূলের পরিষদীয় কাঠামো ভেঙে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের নিয়ে পৃথক ব্লক গঠন করলেন বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঘটনার শুরু গত ২২ মে। দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ‘আকস্মিক’ সাক্ষাৎ হয়। সেই বৈঠকের পর ঋতব্রত শুভেন্দুর প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন, যা দলের ভেতরে কম্পন তৈরি করে। তবে এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আরও আগে। মূলত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক আধিপত্য এবং দলের পুরনো নেতাদের অবজ্ঞার বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। কালীঘাটের এক বৈঠকে ঋতব্রত ও সন্দীপন সাহা সরাসরি অভিষেকের ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন।
২৫ মে থেকে শুরু হয় সই বিতর্ক। অভিযোগ ওঠে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনে বিধায়কদের জাল সই ব্যবহার করেছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। ২৭ মে ঋতব্রত ও সন্দীপন স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানালে জল অনেক দূর গড়ায়। ১ জুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি তদন্তের কথা ঘোষণা করতেই তড়িঘড়ি ঋতব্রত ও সন্দীপনকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। এই বিদ্রোহের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ক্রাউন প্রিন্স’, যার মূল লক্ষ্য ছিল অভিষেকের ক্ষমতা খর্ব করা।
৩০ মে সোনারপুরে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে হেনস্থার শিকার হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ডিম ও ঢিল ছুড়ে তাঁকে আক্রমণ করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘটনার পর দলের সিংহভাগ জনপ্রতিনিধিকে প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখা যায়নি। এর প্রতিফলন ঘটে ৩১ মে মমতার ডাকা বৈঠকে। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২০ জন। কোরাম সংকটের কারণে বৈঠক বাতিল করতে বাধ্য হয় তৃণমূল নেতৃত্ব।
চূড়ান্ত বিচ্ছেদ: ৩ জুন, বুধবার
বুধবার সকাল ১০টা থেকে ছবিটা পরিষ্কার হতে শুরু করে। তৃণমূলের বিদ্রোহী ৫৮ জন বিধায়ক স্পিকারের কাছে পৃথক ব্লক গঠনের চিঠি জমা দেন। যেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নতুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন ও শিউলি সাহার মতো প্রভাবশালী নেতারা। এরপরই তাঁরা নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ফুলবাগান’ বা তাঁর সাজানো সংগঠনটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব এবং নেতৃত্বের সংঘাতই প্রধান কারণ। এই ভাঙন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অস্তিত্বকে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল।
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments