Image description

‘ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, বিএনপি সরকার কোনো অন্যায় করে না। আমরা বিএনপি সরকারের কাছে কিছু প্রাপ্য আশা করি। আমার স্বামী নেই। আমার দুই ছেলে, মা ও শাশুড়ি-সকলেই আমার রোজগারের ওপর নির্ভরশীল। কোনো নোটিশ ছাড়া আমাদের বের করে দিয়েছে। আমাদের আইডি কার্ড কেড়ে নিয়েছে। এমনকি জুতা পর্যন্ত পরে আসতে দেয়নি। সকালে অফিসে এসে যখন পাঞ্চ করতে গিয়েছি, তখন দেখি আমার পাঞ্চ নিচ্ছে না। আমাদের পাওনা টাকা-পয়সা না দিয়েই ফ্লোর থেকে বের করে দিয়েছে। আমাদের অপরাধ কী?’-পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির পর কাজে ফিরেই আল মুসলিম গ্রুপের’ কারখানা থেকে আকস্মিক চাকরি হারিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে ও গভীর আক্ষেপে কথাগুলো বলছিলেন এক নারী শ্রমিক।

আজ শনিবার (৬ জুন) দুপুরে সাভারে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে চাকরিচ্যুত এমন আরও অনেক শ্রমিককে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

এর আগে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘আল মুসলিম গ্রুপের’ সাভার ও আশুলিয়ার তিনটি কারখানা থেকে একযোগে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির পর আজ শনিবার কারখানা খোলার প্রথম দিনেই বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এই নোটিশ দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। কারখানায় ঢুকতে না পেরে তারা মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ভোর থেকেই কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সাভার ও আশুলিয়ার তিনটি কারখানায় ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের তালিকা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সাভার পৌর এলাকার উলাইলের ‘একেএম নীটওয়্যার লিমিটেড’ থেকে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৮৬ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এছাড়া রেডিও কলোনি এলাকার ‘প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়ার’ কারখানা থেকে ৫২৯ জন এবং আশুলিয়ায় ‘আল মুসলিম অ্যাপারেলস’ কারখানা থেকে ৫৩ জন শ্রমিক-কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আজ সকালে রেডিও কলোনি ও উলাইল এলাকার দুটি কারখানার সামনে ছাঁটাকৃত শ্রমিকদের অনেককে অবস্থান করতে দেখা যায়। অনেকে কারখানার ফটকের পাশের দেয়ালে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের তালিকায় নিজের নাম খুঁজছিলেন।

কারখানাটিতে কর্মরত আরেক শ্রমিক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা তারেক রহমানের কাছে বিচার চাই। আমরা তারেক জিয়াকে ভোট দিয়েছি। আমরা চেয়েছি তারেক রহমান স্যার বাংলাদেশে আসুক, জয়ী হোক, আর আমরা যেন একটু শান্তিতে থাকতে পারি। কিন্তু এমন শান্তি পেলাম যে নিজের পেটেই লাথি খেলাম। আমাদের কারখানার মালিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার সরকার এখন ক্ষমতায়। আর ঈদের আনন্দের পরপরই আমাদের এভাবে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে-এটা আমরা কখনোই ভাবিনি। পাওনা টাকা দিলেও এই বাজারে নতুন চাকরি পাওয়া অসম্ভব। আমরা আমাদের রুটি-রুজির অধিকার ফেরত চাই।”

উল্লেখ্য, আল মুসলিম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো মুন্সীগঞ্জ-১ (সিরাজদিখান ও শ্রীনগর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

কারখানার সামনে জরো হওয়া শ্রমিকেরা দাবি করেছেন, ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি। ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। উলাইল এলাকার কারখানার সুইং সেকশনের শ্রমিক সাব্বির হোসেন বলেন, ‘ঈদের ছুটির আগে আমাদের ২০ দিনের বেতন দেয়। আমাদের কোনো নোটিশ না দিয়া ছাঁটাই করা হইছে। আজকে (শনিবার) শুনি আমার চাকরি নাই। ওভার টাইম করতে হয়, আর তারা বলে কাজ নাই।’

নাজমা আক্তার নামে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘তিন বছর ধরে হেলপার হিসেবে কাজ করি। ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেছিলাম। ছুটি শেষে সকালে কারখানায় ঢুকছি তারা আমার আইডি কার্ড নিয়া গেছে, চাকরি নাই কইয়া কইছে মোবাইলে মেসেজ দেখনে গা। বাসায় গিয়া মোবাইলে দেখি কোন মেসেজ নাই।’

একযোগে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে আল মুসলিম গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান বলেন, ‘গ্রুপের তিনটি কারখানায় শ্রমিক-কর্মকর্তাসহ প্রায় ২৭ হাজার মানুষ কাজ করেন। সেই সংখানুপাতে ১ হাজার ৮৬৮ জনকে ছাঁটাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত নগণ্য। চলমান বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মন্দা ও তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার কারণে বাধ্য হয়েই শ্রম আইনের ২০ ধারা ব্যবহার করে এই কর্মী ছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আইন ও কোম্পানির নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক শ্রমিকের বকেয়া বেতনসহ যাবতীয় আইনগত পাওনাদি সম্পূর্ণ পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে।’

তবে একাধিক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২০ ধারা অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারলেও, ২১ ধারা অনুসারে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদেরকে পরবর্তীতে কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সাপেক্ষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে-সেটির কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান কি হবে সেটি নিয়ে ভাবা দরকার ছিল। অন্যান্য সেক্টরে যতো সময় যাবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক দক্ষ হয়ে উঠবেন তার চাকুরির নিশ্চয়তা ততো বেশি। তবে গার্মেন্টস সেক্টরে এর উল্টোটা হয়। যাদের ইনক্রিমেন্ট এবং গ্রেড বৃদ্ধি পাওয়ায় বেতন বেড়ে যায় তাদের ছাঁটাই করা হয়।’

তিনি আরও জানান, কারখানায় কাজ না থাকলে মালিকপক্ষ শ্রম আইনের ২০ ধারায় শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারেন। তবে পরবর্তীতে নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হলে, ছাঁটাই হওয়া এই শ্রমিকদেরকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। ঈদের ছুটির পর আজ প্রথম দিন হওয়ায় ছাঁটাই হওয়া অনেক শ্রমিক এখনও খবরটি জানেনই না। শ্রমিকরা আইনি বা সাংগঠনিক সাহায্য চাইলে ইউনিয়ন অবশ্যই তাদের পাশে দাঁড়াবে।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১–এর পুলিশ সফল (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘শিল্পাঞ্চলে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতিন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অরাজকতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্প পুলিশের সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।’