Image description

কালের বিবর্তন আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম-বাংলার প্রাচীন কৃষি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ বাঁশ ও বেতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী গৃহস্থালি পণ্য। জমিতে ফসল কাটা, বহন করা এবং সংরক্ষণের কাজে একসময় যা ছিল কৃষকের অপরিহার্য সঙ্গী, আজ তা প্লাস্টিকের সামগ্রীর তীব্র দাপটে বিলুপ্তির পথে।

সোমবার (১৫ জুন) হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার একটি গ্রামীণ সড়কে দেখা মেলে এক ভিন্নধর্মী ও চোখ জুড়ানো দৃশ্যের। মাথার পাকা চুল আর বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়া এক পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ কাঁধে বাঁশের তৈরি বিশালাকৃতির খাঁচা (আঞ্চলিক নাম কলই) নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলছেন। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি এগুলো বিক্রি করছেন। আধুনিকতার এই যুগে এমন দৃশ্য যেন এক ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিচারণ।

স্থানীয় প্রবীণ কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় লাখাই অঞ্চলের কৃষকরা ধান কাটা ও ফসল বহনের জন্য সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব বাঁশ ও বেতের তৈরি এসব খাঁচার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কারিগররা পরম যত্নে বাঁশ চটা করে ও বেত বুনে এসব টেকসই কৃষি সরঞ্জাম তৈরি করতেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারে সস্তা, হালকা এবং কৃত্রিম প্লাস্টিকের বস্তা ও ঝুড়ির সহজলভ্যতার কারণে এই কুটির শিল্পের চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

কাঁধে করে খাঁচা বিক্রি করতে আসা ওই প্রবীণ বিক্রেতা আক্ষেপের সাথে জানান, "আগে একেকটা ধান কাটার মৌসুমে এই কাছা বা কলই বানাইয়া কুলাইয়া উঠতে পারতাম না। কৃষকরা আগাম বায়না দিয়া রাখত। অহন প্লাস্টিকের জিনিসে বাজার ভইরা গেছে, আমাগো জিনিসের আর আগের মতো কদর নাই। তাও বাপ-দাদার এই পেশাটারে আকড়াইয়া ধইরা রাখছি। দিনশেষে ফেরি কইরা দু-একটা বিক্রি হইলে যা লাভ হয়, তা দিয়াই কোনোমতে সংসার চলে।"

পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রী আমাদের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে, অথচ ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী ছিল সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। প্লাস্টিকের আগ্রাসনে শুধু যে ঐতিহ্য হারাচ্ছে তা-ই নয়, এই শিল্পের সাথে জড়িত শত শত কারিগর ও বিক্রেতা আজ জীবিকা হারিয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলার এই প্রাচীন লোকশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব কৃষি সরঞ্জামগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবকণ্ঠ/ডিআর