Image description

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই যাঁর গান ও গ্ল্যামার বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয়ে দোলা দেয়, তিনি হলেন ল্যাটিন পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ কিংবা ‘লা লা লা’ গানের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার সমার্থক হয়ে উঠেছেন কলম্বিয়ান এই তারকা। তবে অনেকেরই হয়তো অজানা, বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো এই শিল্পী একসময় নীরবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিধ্বস্ত উপকূলের মানুষের দুর্দশা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছিলেন তিনি।

সে বছর সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল যখন লণ্ডভণ্ড, ঠিক তখনই জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের এক আকস্মিক সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। ১৬ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকায় পা রাখলেও তিনি রাজধানীতে সময় নষ্ট করেননি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দ্রুত ছুটে যান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দক্ষিণাঞ্চলে।

সফরের দ্বিতীয় দিন পটুয়াখালীর সিডর-আক্রান্ত এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ছিল ১১ বছর বয়সী নিপা নামের এক শিশুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। সিডরে মা-বাবাকে হারানো নিপা শাকিরাকে বাংলায় একটি শোকের গান শুনিয়েছিল, যার অর্থ ছিল- ‘মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো।’ গানটি শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি শাকিরা। পরে স্মৃতিচারণ করে তিনি জানিয়েছিলেন, নিপার সেই কণ্ঠ তিনি জীবনেও ভুলতে পারবেন না।

শাকিরা সেসময় জানিয়েছিলেন, পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এবং স্বজনহারা মায়েদের কান্না তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে এত ধ্বংস ও শোকের মাঝেও আধা-ভাঙা একটি স্কুলে শিশুদের খেলতে, গাইতে ও হাসতে দেখে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। শিশুদের মুখে ডাক্তার বা নার্স হওয়ার ইতিবাচক স্বপ্ন তাকে মুগ্ধ করেছিল।

এছাড়াও শাকিরা রাজশাহীতে ইউনিসেফের একটি প্রকল্পও পরিদর্শন করেন। মূলত ১৮ বছর বয়স থেকেই তিনি শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন ‘পিয়েস দেসকালসোস’ (খালি পা)-এর মাধ্যমে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তা করেন। ছোটবেলায় বাবার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং কলম্বিয়ার রাস্তায় শিশুদের দুর্দশা দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।

আকর্ষণীয় দিক হলো, শাকিরার এই সফরটি ছিল একেবারেই প্রচারণামুক্ত। ইউনিসেফ জানিয়েছিল, তিনি নিজেই চেয়েছিলেন মিডিয়ার আড়ালে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বাস্তব অবস্থা নিজের চোখে দেখতে। সফর শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন সবাই মিলে বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও শিশুদের পাশে দাঁড়ায়।

আজ যখন ফুটবল উন্মাদনা বা মঞ্চের পারফরম্যান্স নিয়ে শাকিরাকে ঘিরে মাতামাতি হয়, তখন হয়তো অনেকেই জানেন না— প্রায় দুই দশক আগে এই তারকাই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে দুর্গত মানুষের কষ্ট নিজের হৃদয়ে ধারণ করে ফিরেছিলেন।

মানবকণ্ঠ/আরআই