“আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব?”-মা ও তিন বোনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার এই কথাই বলছিলেন জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। মুহূর্তের মধ্যেই যেন তার পুরো পৃথিবী শূন্য হয়ে গেছে। যে সংসারে ছিল মায়ের স্নেহ আর তিন বোনের হাসি, সেই ঘর এখন নিঃসঙ্গ।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোডের একটি ভাড়া বাসায় বৃহস্পতিবার সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে-সায়মা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) ও শিফা আক্তার। একই ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হন প্রধান সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার (২৫)। একদিনে পাঁচ প্রাণহানির এ ঘটনায় শোক ও আতঙ্ক নেমে এসেছে পুরো রায়পুরে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর এক ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্যেও সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি। সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেই স্বপ্ন চিরতরে থেমে যায়। দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনুর ও তার তিন মেয়ের ওপর হামলা চালায়। ঘটনাস্থলেই শাহিনুর, সায়মা ও শিফার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত ইকরা ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান। পরে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে নিহত হন সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার।
ঘটনার সময় পরিবারের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম সিফাত কর্মস্থলে ছিলেন। তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রায়পুর বাজার কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। খবর পেয়ে বাসায় এসে একসঙ্গে মা ও তিন বোনের মরদেহ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।
শুক্রবার লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে নিহত পাঁচজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রায়পুরে প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে।
অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদারের মরদেহ এখনো লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তার স্বজনদের খবর দেওয়া হলেও তারা এখন পর্যন্ত মরদেহ নিতে আসেননি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকের ধারণা, একই সময়ে চারজনকে হত্যা করা একজনের পক্ষে কঠিন হতে পারে। তাই ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে পুলিশ বলেছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
রায়পুর বাজার কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, “এ ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
ঘটনার পরপরই পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামানও ঘটনাস্থল ঘুরে তদন্তে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। বর্তমানে পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছে।
রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহিন মিয়া বলেন, “ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।”




Comments