Image description

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়ার উন্মুক্ত স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে। চলতি বিশ্বকাপের এই হাইভোল্টেজ নকআউট ম্যাচটি রূপ নিতে পারে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে উত্তপ্ত ও বিপজ্জনক ম্যাচে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে মাঠের ফুটবলার থেকে শুরু করে গ্যালারির হাজার হাজার দর্শকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের (এনডব্লিউএস) বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার যৌথ প্রভাবে শনিবার হিট ইনডেক্স ৩৭.৭ থেকে ৪৬.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট। এর আগে চলতি সপ্তাহেই নিউ জার্সিতে সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন ৩২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ফরাসি খেলোয়াড়দের মাঠের পানি ছিটানোর যন্ত্র দিয়ে শরীর ঠান্ডা করতে দেখা গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর এই তীব্র গরম নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই উদ্বেগ বাড়ছিল। জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘বার্কলে আর্থ’-এর মতে, ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন শেষবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তার চেয়ে বর্তমান বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.২৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) স্পষ্ট জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই নজিরবিহীন গুমোট গরমের সৃষ্টি হয়েছে।

এই চরম পরিস্থিতিতে ফিফার বর্তমান ‘হিট সেফটি গাইডলাইন’ বা গরমসংক্রান্ত নিরাপত্তানীতিকে ‘অপ্রতুল’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। বর্তমানে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের গতিবেগের সম্মিলিত হিসাব ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে ম্যাচ স্থগিত করা হবে। তবে কানেকটিকাট ইউনিভার্সিটির কোরি স্ট্রিংগার ইনস্টিটিউটের সিইও ডগলাস কাসা এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এতটাই বিপজ্জনক যে, খোদ মার্কিন সামরিক বাহিনীতে এই তাপমাত্রা হলে ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ জারি করে সব ধরনের ট্রেনিং বাতিল করা হয়।’

খেলোয়াড়দের বৈশ্বিক ইউনিয়ন (ফিফপ্রো) এবং আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন ইতিমধ্যেই ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা হলেই ম্যাচ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির (ইউসিএলএ) হিট ল্যাবের পরিচালক ভরত ভেঙ্কট জানান, প্রচণ্ড গরমে ভারী ব্যায়াম বা খেলাধুলা করলে শরীর নিজে থেকে ঠান্ডা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে চরম ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশিতে টান এবং মারাত্মক ডিহাইড্রেশন হতে পারে। এমনকি অ্যাথলেটদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ হলো এই ‘হিট স্ট্রোক’।

এই গরমের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে দলগুলো বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ব্রাজিল দলের স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট গুইলহার্ম পাসোস জানান, খেলোয়াড়দের মানিয়ে নেওয়ার জন্য তারা সৌনা (Sauna) ও হট বাথ ব্যবহার করছেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের তীব্র গরমে খেলার অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে খেলোয়াড়রা সাধারণত মাঠে বেশি দৌড়াদৌড়ি না করে তাদের টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল নিখুঁত পাসের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।’

ঝুঁকি কেবল মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের নয়, গ্যালারিতে থাকা দর্শকদেরও। অনেকেই অ্যালকোহল পান করে দীর্ঘ সময় খেলা দেখেন, যা এই গরমে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আয়োজক শহর ও স্টেডিয়ামগুলোতে ছায়া, ওয়াটার স্টেশন এবং বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্পের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এমআর