টানা অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। সোমবার (৬ জুলাই) বিকেল ৩টা থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।
অবিরাম বৃষ্টিতে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, ব্যাহত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবা। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সেনাবাহিনী মাঠে কাজ করলেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিন চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।
সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দিনভর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাদামতলী, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, মোহরা, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, হালিশহর, পতেঙ্গা, সিটি গেট, বহদ্দারহাট ও শোলকবহরসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। এতে সড়ক ও ড্রেনের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। পানিতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে যায়, আর গণপরিবহন সংকটে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেককে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।
জলাবদ্ধতার মধ্যেই নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ভেজা পোশাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছায়।
স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হয়েছে। বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলায় পানি ঢুকে জরুরি বিভাগ, ল্যাবরেটরি ও প্রশাসনিক কক্ষ প্লাবিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তারা দেখেননি। অনেক এলাকায় মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।
টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বাড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শন করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না থাকার অনুরোধ জানান তিনি।
চসিকের তথ্যমতে, নগরের অন্তত ৯ থেকে ১০টি ওয়ার্ড জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন।
এদিকে, জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড যৌথভাবে পানি নিষ্কাশনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।




Comments