Image description

সবুজ-শ্যামল বাংলার আনাচে-কানাচে কালের সাক্ষী হয়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যা দেখে অনুমান করা সম্ভব—ধন ও ধান্যে একসময় কতটা সমৃদ্ধ ছিল এই বাংলা। অতীতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ও প্রাসাদোপম সেই স্থাপত্যশৈলীগুলোর মধ্যে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার ‘বালিয়াটি জমিদার বাড়ি’ অন্যতম। এটি বাংলার জমিদারদের শৌর্য, সমৃদ্ধি এবং বিলাসিতার এক এক জীবন্ত মহাকাব্য।

বালিয়াটি জমিদারদের আদি ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। ঘিওর থানার বিনোদপুর থেকে মহেশরাম সাহা ভাগ্যান্বেষণে বালিয়াটিতে আসেন এবং এক পান ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। তার ছেলে ঘনেশরাম পরবর্তীতে লবণের ব্যবসা করে প্রভূত উন্নতি করেন। ঘনেশরামের নাতি গোবিন্দরামের চার ছেলে—আনন্দরাম, দধিরাম, পণ্ডিতরাম ও গোপালরামের হাত ধরেই মূলত বালিয়াটিতে জমিদারি ও বিশাল প্রাসাদের সৃষ্টি হয়।

আঠারো শতকের প্রথম দিকে এখানে মোট পাঁচটি বিশাল বাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—গোলাবাড়ি, পূর্ব বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি, মধ্য বাড়ি ও উত্তর বাড়ি। বর্তমানে 'দশ আনী' অংশটিই পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে টিকে আছে।

দশ আনী জমিদার বাড়িটি প্রায় ৫৮৮ একর জমির ওপর নির্মিত। রাজচন্দ্র (বড় তরফ), ঈশ্বরচন্দ্র (মাঝার তরফ), ভগবান চন্দ্র (নয়া তরফ) ও ভৈরবচন্দ্র (ছোট তরফ)—এই চার ভাইয়ের জন্য লন্ডনী ও কলকাতায় নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছিল এসব তিনতলা ও দ্বিতল ভবন। প্রতিটি ইঞ্চিতে নকশা ও কারুকার্য আজও পর্যটকদের বিমোহিত করে। বাড়ির ভেতরে রয়েছে বিশাল সান বাঁধানো সাত ঘাটলার পুকুর। কথিত আছে, বিভিন্ন পূজা-পার্বণে সাত ঘাটের পানির প্রয়োজন হতো বলেই এমন আয়োজন।

একসময় এই বালিয়াটি জমিদারদের প্রতাপ ছিল আকাশচুম্বী। স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে, ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির সামনে দিয়ে সাধারণ মানুষ ছাতা মাথায় বা জুতো পায়ে যাতায়াত করতে পারতো না। খাজনা আদায়ে কঠোর হওয়ার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাদের ‘রায় বাহাদুর’ খেতাবে ভূষিত করে। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর গণরোষ ও লুটপাটের শিকার হয়ে জমিদাররা সপরিবারে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে সরকার এটি অধিগ্রহণ করে এবং ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।

বিলাসী জীবন যাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল ‘রংমহল’। একসময় যেখানে নাচ-গানের আসর বসত, তা আজ একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর। লন্ডনী ঝাড়বাতি, লোহার অর্ধশতাধিক বিশাল সিন্দুক, ঐতিহ্যবাহী পালঙ্ক, নকশাখচিত কাঠের আলমারি, শ্বেতপাথরের টেবিল, স্ফটিকের তৈরি সামগ্রী ও জমিদারদের ব্যবহৃত অসংখ্য নিদর্শন সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে। দেয়ালের লতাপাতার নকশা ও ছাদের লোহার কারুকাজ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।

জমিদার বাড়ির অদূরে ১৯২০ সালে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ডে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড স্কুল’ স্থাপন করা হয়েছিল। সে সময় কেবল অভিজাত পরিবারের সন্তানদের জন্য স্কুলটি সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমানে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। স্কুল প্রাঙ্গণের পুরোনো ভবন এবং সারি সারি নারিকেল-সুপারি বীথি আজও এক ছায়াসুনিবিড় পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখে।

কালের বিবর্তনে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলেও বালিয়াটি জমিদার বাড়ি আজ পর্যটক ও গবেষকদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই অট্টালিকাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলার এক হারানো স্বর্ণালি অধ্যায়কে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর