২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা চলছে, সকালের ব্যস্ত ঢাকা। রওশন আরা প্রতিদিনের মতো নিজের প্রাইভেট কারে ছেলে আসিফকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিলেন।
গাড়ি থেকে নামার আগে আসিফ বলল, "আম্মু, পরীক্ষা শেষ হলে একটু কেএফসিতে যাব? অনেকদিন কোথাও খাওয়া হয় না।"
রওশন আরা হেসে বললেন,
— "পরীক্ষার সময় এসব?"
— "প্লিজ আম্মু। আজকের পরীক্ষাটা ভালো হলে ছোট্ট একটা ট্রিট।"
— "আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে বেশি সময় না।"
আসিফ হাসিমুখে হলে ঢুকে গেল।
পরীক্ষা শেষে বের হয়েই আসিফ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলেকে ডাকল।
— "মারুফ! এইদিকে আয়।"
মারুফ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। হাঁটার ভঙ্গিটা অস্বাভাবিক। এক পায়ে কৃত্রিম অঙ্গ।
আসিফ বলল,
— "আম্মু, ও আমার বন্ধু মারুফ। আজ ওকেও নিয়ে চল না?"
রওশন আরা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।
— "অবশ্যই। এসো বাবা।"
মারুফ একটু সংকোচে বলল,
— "না আন্টি, কষ্ট হবে।"
— "কষ্ট হবে কেন? তুমি তো আসিফের বন্ধু।"
তিনজন কেএফসিতে ঢুকলেন।
খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো।
আসিফ চিকেন নিল, মারুফ শুধু ছোট্ট একটা বার্গার নিতে চাইছিল।
রওশন আরা বললেন,
— "এত কম কেন?"
— "এতেই হবে আন্টি।"
— "না, সবাই যা খাবে তুমিও তাই খাবে।"
মারুফ মৃদু হাসল।
খাওয়ার অপেক্ষায় গল্প শুরু হলো।
রওশন আরা জিজ্ঞেস করলেন,
— "কোন কলেজে পড়ো?"
— "সরকারি কলেজে, আন্টি।"
— "পায়ের কী হয়েছে?"
প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল মারুফ।
তারপর ধীরে বলল,
— "আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই, আজকের এই দিন"
রওশন আরা অবাক হলেন।
— "তারপর?"
— "আজিমপুরে মিছিলে ছিলাম।"
কথা বলতে বলতে তার চোখ নিচু হয়ে গেল।
— "হঠাৎ গুলি শুরু হলো। সবাই দৌড়াচ্ছিল। আমার সামনে চারজন পড়ে গেল। পরে শুনলাম, তারা আর বাঁচেনি। একটা গুলি এসে আমার পায়ে লাগে। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছিলেন... কিন্তু শেষ পর্যন্ত পা কেটে ফেলতে হয়।"
টেবিলের ওপর নীরবতা নেমে এল।
আসিফও চুপ।
রওশন আরা ধীরে বললেন,
— "ইন্না লিল্লাহ... এরপর? "
— "তখন এসএসসি রেজাল্ট এর অপেক্ষায় ছিলাম। পরে গোল্ডেন এ+ পাই। সবাই বলেছিল, 'তুমি অনেক দূর যাবে।'"
রওশন আরা হাসতে চাইলেন।
— "এখনো তো যেতে পারো।"
মারুফ মাথা নাড়ল।
— "কিন্তু সবকিছু বদলে গেছে।"
আসিফ বলল,
— "তুই তো এখনো অনেক ভালো ছাত্র।"
— "ভালো ছাত্র হলেই সব হয় না, আসিফ।"
— "কেন?"
— "অনেক জায়গায় গেলে মানুষ আগে আমার পা দেখে, পরে আমার রেজাল্ট দেখে।"
রওশন আরা বললেন,
— "সব মানুষ এমন নয় বাবা।"
মারুফ হালকা হেসে বলল,
— "জানি আন্টি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়... সবকিছুই আগের মতো। নতুন কিছুই নেই।"
রওশন আরা প্রশ্ন করলেন,
— "কেন এমন মনে হয়?"
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আমরা ভেবেছিলাম, মানুষ মানুষের কষ্ট বুঝবে। যোগ্যতার মূল্য বাড়বে। আহতদের পাশে সবাই দাঁড়াবে।"
— "হয়নি?"
— "অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেছে। খবরের শিরোনাম বদলে গেছে। আমরা যেন পুরোনো খবর।"
আসিফ বলল,
— "তুই এত হতাশ কেন?"
— "কারণ আমি শুধু একটা পা হারাইনি। অনেক স্বপ্নও হারিয়েছি। ফুটবল খেলতাম। পাহাড়ে উঠতে চাইতাম। সেনাবাহিনীতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। এখন সবই গল্প।"
রওশন আরা শান্ত গলায় বললেন,
— "তোমার জীবন কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি।"
— "জানি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ দ্রুত ভুলে যায়।"
খাবার চলে এল।
রওশন আরা বললেন,
— "খেতে খেতে মন খারাপের কথা নয়।"
মারুফ একটু হাসল।
— "আপনি জানেন আন্টি, হাসপাতালে যখন ছিলাম, তখন এক ছোট ছেলে আমাকে বলেছিল—'ভাইয়া, আপনার পা আবার গজাবে?' আমি ওকে কী উত্তর দেব বুঝিনি।"
আসিফ হেসে ফেলল।
— "তুই কী বলেছিলি?"
— "বলেছিলাম, 'না, কিন্তু আমি আবার হাঁটতে শিখব।'"
রওশন আরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— "শোনো মারুফ, একটা কথা বলি?"
— "জি?"
— "জীবনে অনেক অন্যায় থাকে। কিন্তু একজন মানুষ যদি অন্য একজন মানুষের আশা ফিরিয়ে দিতে পারে, সেটাও বড় পরিবর্তন।"
— "কিন্তু সমাজ?"
— "সমাজও একজন একজন মানুষ দিয়েই তৈরি। তুমি যদি হাল ছেড়ে দাও, তাহলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও কমে যাবে।"
আসিফ বলল,
— "আমরা তো বন্ধু আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব একসঙ্গে।"
মারুফ তাকিয়ে রইল।
— "সত্যি?"
— "অবশ্যই। তোর কৃত্রিম পা দেখে আমি তোকে বিচার করি না। তুই আমার বন্ধু, এটাই পরিচয়।"
রওশন আরা বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
বের হওয়ার সময় তিনি বললেন,
— "মারুফ, একটা অনুরোধ করব?"
— "জি আন্টি।"
— "আজকে তুমি বললে, 'সবকিছুই আগের মতো।' আমি বলব, পুরোটা সত্যি নয়। যদি সব আগের মতোই থাকত, তাহলে আজ আমার ছেলে তোমাকে জোর করে আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসত না। আমরা একসঙ্গে বসে তোমার গল্পও শুনতাম না। ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই একদিন বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হয়।"
মারুফ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মুখে একটুখানি হাসি ফুটল।
— "হয়তো... আপনি ঠিকই বলছেন, আন্টি। সবকিছু আগের মতো নয়। কিছু মানুষ এখনো মানুষের গল্প শুনতে চায়।"
কেএফসি থেকে বেরিয়ে তিনজন ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা আগের মতোই ছিল। গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড়, যানজট—সবই একই রকম।
কিন্তু অন্তত তিনজন মানুষের মনে সেদিন একটি নতুন উপলব্ধি জন্ম নিয়েছিল—পরিবর্তন কখনো কখনো শোরগোল করে আসে না; নিঃশব্দে, একজন মানুষের সহানুভূতি থেকে আরেকজন মানুষের আশার মধ্যে জন্ম নেয়।
মানবকণ্ঠ/এমআর




Comments