Image description

মোহম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ- পরিচালক মো. মাকসুদুর রহমান। নবম গ্রেডের এই কর্মকর্তা বেতন ও ভাতা মিলিয়ে মাসে সর্বমোট ৬৫ হাজার টাকার মতো পান। তার স্ত্রী মো. মাকসুদুর রহমান একজন গৃহিনী। বিদ্যমান বাজারব্যবস্থায় এই আয়ে একটি পরিবার হয়তো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। অথচ এই কর্মকর্তা গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল পাহাড়।

রাজধানীর গুলশান, লালবাগ, বাড্ডা, জোয়ারাসাহারা, মানিকদিতে নিজের ও স্ত্রী নামে কেনা হয়েছে জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট। রয়েছে নিজ নামে গাড়ি। সব মিলিয়ে এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৬০ কোটি টাকা। মানবকণ্ঠের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

টাকার বিছানায় ঘুমানো এই কর্মকর্তার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচরে। স্ত্রী নাসরিন আক্তারের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায়। বর্তমানে তারা থাকেন রাজধানীর মানিকদী এলাকায়। মো. মাকসুদুরের পিতা মো. সিদ্দিকুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সেই সূত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় একই পরিবারের ৯ সদস্য সরকারি চাকরি করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মো. মাকসুদুর রহমানের এই বিশাল সম্পদের বড় অংশই অর্জিত হয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কর্মরত থাকাবস্থায়। অবৈধভাবে আয় করা এসব অর্থের লেনদেন হয়েছে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে।

রাজধানীর পাঁচ এলাকায় জমি: সরেজমিনে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মো. মাকসুদুরের নিজের নামে এবং স্ত্রীর নামে ঢাকার পাঁচটি এলাকায় জমি রয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর মাঝে বেশির ভাগ সম্পদ ক্রয় করেছেন স্ত্রীর নামে। নিজের নামে লালবাগে এবং মানিকদিতে জমির শেয়ারসহ ফ্ল্যাট রয়েছে। লালবাগে বোন রেহেনা এবং শ্যালিকা সোনিয়ার আক্তারের সাথেও যৌথভাবে জমির শেয়ার রয়েছে মাকসুদুর রহমানের।

যত জমি ও সম্পত্তি: রাজধানীর লালবাগ এলাকায় দাগ নং-৭০১, হোল্ডি নং-৩৩/১০, খতিয়ান নং-২৫০২ মৌজা দক্ষিণ সোনা টেংগর, শিবপুর ভূমি অফিসের আওতায় ০ দশমিক ৭৩৮ শতাংশ (আবাসিক) জমিসহ ফ্ল্যাটের শেয়ার, যার বর্তমান বাজার মূল্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা প্রায়। একই এলাকায় মৌজা দক্ষিণ সোনা টেংগর- ৫, দাগ নং ৭০১, খতিয়ান নং- ২০২৫/১০০১০৭, হোল্ডিং নং- ২০২৫ / ১০০১০৭, শিবপুর ভূমি অফিসের আওতায় ০ দশমিক ৩৩৩৩ শতাংশ জমি রয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় পৌণে ২ কোটি টাকা।

স্ত্রীর নাসরিন আক্তারের নামে গুলশানের ডুমনি-৬ মৌজায় হোল্ডিং নং: ৩৩/৪৭, খতিয়ান নং : ১১৬৭৮, দাগ নং: ১০৮০৩, ১০৮০৭, ১০৮০৮, তিন দাগে ডুমনী ভূমি অফিসের আন্ডারে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ (আবাসিক) যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২১ কোটি টাকা। গুলশানের ডুমনি-৬ মৌজায়, হাল্ডিং নং : ৯১/৩৩, খতিয়ান নং: ৯০২৯, দাগ নং: ১০৮০৩, ডুমনী ভূমি অফিসে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ জমি যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা প্রায় । গুলশানের ডুমনি-৬ মৌজায়, হাল্ডিং নং: ৮৮/৩৩, খতিয়ান নং: ৯০২৬, দাগ নং: ১০৮০৩, ১০৮০৮ ডুমনী ভূমি অফিসে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ জমি যার বাজার মূল্য ৯ কোটি টাকা প্রায়।

ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকা নাসরিন আক্তার এর নামে ০ দশমিক ৬৯৯ শতাংশ জমি, যার দাগ নং: 34427,34327 ও 34324 খতিয়ান নং : ৬১৫১৪, হোল্ডিং নং: ১৭৯/৩১৫, মৌজা জোয়ার সাহারা-৩, ক্যান্টনমেন্ট ভূমি অফিস। বর্তমান বাজার মূল্য ৩ কোটি টাকা প্রায়। ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় নাসরিন আক্তারের নামে ০ দশমিক ০৯৭৬ শতাংশ জমির উপরে ফ্লাট যার দাগ নং: ৩৪৩২৪, ৩৪৩২৮, খতিয়ান নং : ৬১৭২৮, হোল্ডিং নং : ১/৩১৭, মৌজা জোয়ার সাহারা- ৩. ক্যান্টনমেন্ট ভূমি অফিস। যার বর্তমান বাজার মূল্য- ৪ কোটি টাকা প্রায়। এছাড়াও তার নামে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় ০ দশমিক ৩৯৬৭ শতাংশ জমি উপরে ফ্লাট যার দাগ নং: ২০৭৫, খতিয়ান নং : ( ১০৬৪) ২০২৫/১০০১০১, হোল্ডিং নং: ২০২৫/১০০১০১, মৌজা লালাসরাই-৭, দলিল নং: ৫৯৪৫, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস পল্লবী, রেজিস্ট্রেশনের তারিখ: ১৭/০৯/২০১৭ ক্যান্টনমেন্ট ভূমি অফিস। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।

মো. মাকসুদুর রহমান তার বোন রেহেনা রশিদ ও শ্যালিকা সোনিয়া আক্তারের নামে একই দাগে জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়াও তার নামে রাজধানীর পূর্ব মানিকদী, ক্যান্টনমেন্ট, ঠিকানা ৫৭২/জি একটি ফ্লাট রয়েছে। নিজ নামে ঢাকা মেট্রো রেজিস্ট্রেশন নম্বর: চ-২০-৬২৩২ একটি গাড়িও রয়েছে।

সাত ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট মো. মাকসুদুর রহমানের নামে সোনালি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংকে একাউন্ট রয়েছে। স্ত্রী নাসরিন আক্তারের নামে ব্র্যাক ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, বিকাশ : ০১৭১৭*** ৯৩৫, বিকাশ ও নগদ : 01717***264 লেনদেনের পরিমান বিশ্বয়কর এছাড়া নিয়মিত মোবাইল ব্যাংকিংও করেন তিনি। এসব হিসাবে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য অনেক গড়মিল পাওয়া যায়। তাদের আয়কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায় সম্পদের সাথে আয়কর নথির কোন মিল নেই।

পাসপোর্ট অফিসে মাকসুদূর সিন্ডিকেট ও গ্রাহক ভোগান্তি: মানবকণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী দালাল সিন্ডিকেট। এর নিয়ন্ত্রণ করে আনসার কমান্ডার আবু নাসের এবং বাকি আনসার সদস্যগণ মিলে তাকে সহযোগিতা করে। বাইরে সকাল ৯টা থেকে ১০-১৫ জন দালালকে অফিস চলাকালে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- রিঙ্কু, তারিক, সাব্বির, জুয়েল রানা, নিরব, হাসান, নাজমুলসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজন।

এরা সবাই পাশের কম্পিউটার দোকানের মালিক অথবা কর্মচারী তারা অফিসের সামনে দাড়িয়ে থেকে সাধারণ মানুষকে টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেয়ার জন্য নিজেদের কার্ড দেন। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গেলে সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক নিয়মে পাসপোর্ট করা প্রায় অসম্ভব। নানা অজুহাতে আবেদনকারীদের ফেরত পাঠানো হয়, ভুল ধরিয়ে হয়রানি করা হয়।

মানবকণ্ঠ/আরআই