Image description

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দেশটির বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ পুরো দেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, যার ফলে কার্যত বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইরান।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের সামনে মাথা নত না করার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভকারীরা প্রবাসী বিরোধী গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করছে। এদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের প্রভাব
গত দেড় দশকে ইরানে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বিক্ষোভ হলেও এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ধকল এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরান সরকার বর্তমানে বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এরই মধ্যে বিক্ষোভে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

শুরুতে অর্থনীতির বেহাল দশা, ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান অর্ধেকে নেমে যাওয়া এবং ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন তা মোড় নিয়ে সরাসরি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

অগ্নিগর্ভ রাজপথ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশটির ভেতরের খবরাখবর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরানে ফোন কলও ঢুকছে না। দুবাই বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, দুবাই ও ইরানের মধ্যে অন্তত ১৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

গত মাসের শেষের দিকে দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করলেও তা দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় এবং মফস্বল শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। তরুণরা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ফুটেজে জ্বলন্ত বাস, গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং রেলস্টেশন ও ব্যাংকে আগুনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। সরকার এই অস্থিরতার জন্য বিদেশে অবস্থানরত বিরোধী দল ‘পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন’ (এমকেও)-কে দায়ী করেছে।

কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী শহর রাশত থেকে এক সাংবাদিক জানান, এলাকাটিকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো মনে হচ্ছে এবং সব দোকানপাট ধ্বংস হয়ে গেছে। রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানে শত শত মানুষ মিছিল করছে এবং এক নারীকে ‘খামেনির মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিতে শোনা গেছে।

ইরানি মানবাধিকার সংস্থা ‘হেনগাও’ জানিয়েছে, শুক্রবার জুমার নামাজের পর জাহেদানে বালুচ সংখ্যালঘুদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে বেশ কয়েকজন আহত হন।

খামেনির কঠোর হুঁশিয়ারি
কর্তৃপক্ষ অর্থনীতির দাবিতে বিক্ষোভকে বৈধ বললেও সহিংসতাকে কঠোর হাতে দমনের ঘোষণা দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি তার ভাষণে বলেন, “লাখো সম্মানিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে। ভ্যান্ডাল বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সামনে সরকার পিছু হটবে না।” তিনি বিক্ষোভকারীদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার চেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করেন।

ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসাইন মোহসেনি এজেয়ি জানিয়েছেন, দাঙ্গাকারীদের শাস্তি হবে ‘কঠোর, সর্বোচ্চ এবং কোনো আইনি ছাড় ছাড়াই’।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিরোধীদের অবস্থান
ইরানের প্রবাসী বিরোধী দলগুলো আরও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তারা ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিচ্ছে এবং ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া রাজতন্ত্রের প্রশংসা করছে। প্রয়াত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, “বিশ্বের চোখ আপনাদের দিকে। রাস্তায় নেমে আসুন।” তবে দেশের ভেতরে রাজতন্ত্র বা এমকেও-এর জনপ্রিয়তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

এদিকে, গত গ্রীষ্মে ইরানে বোমা হামলা চালানো এবং গত সপ্তাহে তেহরানকে সতর্ক করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার জানিয়েছেন, তিনি রেজা পাহলভির সঙ্গে দেখা করবেন না এবং তাকে সমর্থন করা ‘যথাযথ হবে কি না’ তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

অন্যদিকে জার্মানি বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, বিক্ষোভ ও সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

মানবকণ্ঠ/বিএস