মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে মব ভায়োলেন্স (গণপিটুনি), সীমান্ত হত্যা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আইনি হয়রানিকে মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এ মাসে মব ভায়োলেন্সে নিহতের সংখ্যা এপ্রিলের ২১ জন থেকে বেড়ে ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৭১ জন। গরু চুরি, ডাকাত সন্দেহে বা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতাকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামক একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে বাধা দেওয়ার ঘটনাটিকে মব-কালচারের একটি প্রকাশ্য রূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তে রক্তক্ষরণ ও ‘পুশ-ইন’
সীমান্ত পরিস্থিতি মে মাসে আরও অবনতি হয়েছে। ভারতীয় ও মিয়ানমার সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে পৌঁছেছে। ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় নির্যাতন ও জোরপূর্বক ‘পুশ-ইন’ করার ১০টি ঘটনা ঘটেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের জন্য বড় হুমকি। এছাড়া মিয়ানমার সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনাটি সীমান্ত সুরক্ষার দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও আইনি হয়রানি
গণমাধ্যমের ওপর চাপের ধরন পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি শারীরিক হামলা (৪৬ থেকে ৩৪) কিছুটা কমলেও বেড়েছে আইনি হয়রানি। মে মাসে ১৩ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা গত মাসে ছিল ৮ জন। সাইবার নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার এবং প্রথম আলোর সম্পাদকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলাগুলোকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কাঠামোগত চাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও গ্রেফতার
মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা (১৯৩ জন) এপ্রিলের (৩০৩ জন) তুলনায় কমলেও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া সরকার পতন পরবর্তী বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারের সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যু ও অজ্ঞাত লাশ
কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ৬ থেকে বেড়ে ৭ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৫৩টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নদী, রেললাইন বা ফসলি জমি থেকে উদ্ধার হওয়া এই লাশগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে না পারা এবং তদন্তের অভাব বিচারহীনতার ইঙ্গিত দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু ও জাতিগত পরিস্থিতি
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রতিমা ভাঙচুর ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের সংখ্যা মে মাসে কমলেও (২টি ঘটনা) বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও অপপ্রচার বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে খাগড়াছড়ির আলুটিলায় ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও ধর্মীয় উসকানি পাহাড়ের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যাগত কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বর্তমানে ‘কাঠামোগত ঝুঁকির’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সাংবাদিকদের ওপর আইনি চাপ এবং সীমান্ত হত্যার মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আইনের শাসন চরম সংকটের মুখে পড়তে পারে।




Comments