আকাশছোঁয়া পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখা বিশ্বের প্রতিটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৯ হাজার ৩১ ফুট উচ্চতার এই শিখর জয় করা যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন, তেমনি এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল একটি অভিযান। অদম্য ইচ্ছা থাকলেও কেবল বিশাল অংকের অর্থের অভাবে অনেক দক্ষ পর্বতারোহী এই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন না। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একবার এভারেস্ট আরোহণের খরচে অনায়াসেই একটি বিলাসবহুল গাড়ি বা একটি নান্দনিক ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব।
মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণের জন্য একজন পর্বতারোহীকে গড়ে ৪০,০০০ ডলার থেকে ১,০০,০০০ ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪৭ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। মূলত আরোহীর সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা এবং এজেন্সির মানের ওপর ভিত্তি করে এই খরচের তারতম্য হয়।
এভারেস্ট অভিযানের খরচের একটি বড় অংশ চলে যায় সরকারি কোষাগারে। নেপাল সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, একজন বিদেশি পর্বতারোহীকে শুধুমাত্র আরোহণের অনুমতি বা পারমিট পেতেই ১১ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ টাকা) জমা দিতে হয়। তবে নেপালের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই খরচ তুলনামূলক অনেক কম; তাদের দিতে হয় মাত্র ৭৫ হাজার নেপালি রুপি। প্রতি বছর নেপাল সরকার নির্দিষ্ট সংখ্যক পারমিট ইস্যু করে, গত বছর যা ছিল ৩২৫টি এবং চলতি বছরে তা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্গম পাহাড়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পর্বতারোহীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন দক্ষ শেরপা ও গাইডরা। তাদের ছাড়া এভারেস্ট জয় প্রায় অসম্ভব। একজন দক্ষ গাইড মাত্র ৪৫ দিনের একটি এভারেস্ট মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার ডলার (প্রায় ১৪ লাখ টাকা) পারিশ্রমিক পান। এমনকি একজন শিক্ষানবিশ গাইডও এই সময়ে প্রায় ৭ হাজার ডলার আয় করেন। এই বিশাল অংকের পারিশ্রমিক আরোহীর মূল বাজেটের অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অতি উচ্চতায় বাতাসের চাপ এবং অক্সিজেনের অভাব মোকাবিলা করতে প্রয়োজন হয় বোতলজাত অক্সিজেন। একেকটি সিলিন্ডারের দাম এবং তা ওপরের ক্যাম্পে বহন করে নিয়ে যাওয়ার খরচ অত্যন্ত বেশি। এছাড়া বিশেষায়িত হাই-অ্যাল্টিটিউড গিয়ার, বুট, স্লিপিং ব্যাগ, শক্তিশালী তাঁবু এবং যোগাযোগের জন্য স্যাটেলাইট ডিভাইসের পেছনে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়।
মাউন্ট এভারেস্টে চড়ার জন্য একজন পর্বতারোহীকে গড়ে দুই মাস সময় হাতে নিয়ে নামতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে বেস ক্যাম্পে অবস্থান, রান্নার লোক এবং প্রতিদিনের খাবারের রসদ সরবরাহের জন্য বাড়তি ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ডলার ব্যয় হয়। এছাড়া প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় দিনের পর দিন বেস ক্যাম্পে অপেক্ষা করতে হয়, যা খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়।
অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের মতে, কম খরচে সস্তা প্যাকেজ নিয়ে এভারেস্ট অভিযানে নামলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে নিম্নমানের অক্সিজেন সিলিন্ডার বা অদক্ষ গাইড পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই পেশাদার পর্বতারোহীরা সাধারণত প্রায় ৭০,০০০ ডলারের (৮২ লাখ টাকা) একটি স্ট্যান্ডার্ড বাজেট নির্ধারণ করে অভিযানে নামেন।
পাহাড় জয়ের জন্য যেমন অদম্য সাহস আর শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি এই বিশাল আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করাও এভারেস্ট জয়ের পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments